1. admin@kagojerbarta.com : admin :
  2. roberttaylor1755ywts@gsasearchengineranker.com : anyapraed2271 :
  3. davidwilson2900s4d@verifiedlinklist.com : gordonhand83 :
  4. jennifermartinez5223xvyc@gsasearchengineranker.com : gustavostamper :
ঢাকা ০৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পরিবার ছাড়া দেখা নিষেধ ‘উৎসব’ নিয়ে কেন এত মাতামাতি

প্রতিনিধির নাম
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মোহাম্মদপুরের পুরোনো অলিগলি, চেনা মুখের ভিড়, হারিয়ে যাওয়া ট্রেনের হুইসেল, আর সেই চিরচেনা পারিবারিক টানাপোড়েন—‘উৎসব’ যেন আমাদের অনেকেরই ফেলে আসা শৈশবের ফ্রেমবন্দি সিনেমা।

চার্লস ডিকেন্সের কালজয়ী ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’–এর দেশি রূপান্তর বলা হলেও, তানিম নূরের এই চলচ্চিত্র ঠিক এক লাইনে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি একসঙ্গে আফসোসের স্বীকারোক্তি, প্রাপ্তির উষ্ণতা এবং নতুন করে বাঁচার উপলক্ষ।

একটি মৃত্যু, উপলব্ধি, এক জীবনের মোড় পরিবর্তন
গল্পের শুরু চাঁদরাতের চিরচেনা ব্যস্ততা দিয়ে। শান্তি নীড়ে চলেছে ঈদের প্রস্তুতি, মোবারক সাহেব (তারিক আনাম খান) প্রতিবারের মতো গাইছেন ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। কিন্তু এবার গান শেষ হয় না, তার জীবনটাই শেষ হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় আবির্ভাব ঘটে কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহাঙ্গীরের (জাহিদ হাসান)। তাকে আপনি চিনে ফেলবেন—এমন আত্মকেন্দ্রিক মানুষ প্রায় সব পরিবারেই একজন থাকেন। উৎসব কমিউনিটি সেন্টারের কিপটে কর্ণধার, শিশুদের গানে বিরক্ত হয়ে পুলিশ ডাকার মতো অসহিষ্ণু, এমনকি বিড়ালের দৌরাত্ম্যেও রাগে ফেটে পড়েন। তাই আশপাশের মানুষ তাকে ডাকে ‘খাইষ্টা জাহাঙ্গীর’ নামে।

কিন্তু মোবারকের মৃত্যুর রাতেই বদলে যেতে থাকে সবকিছু। অতীতের ভূতরা (চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান, অপি করিম) হাজির হয় জাহাঙ্গীরের জীবনে। তার জীবন সিনেমার মতো খুলে পড়ে—যেখানে আছে অপ্রাপ্তি, ভুল, ভালোবাসা হারানোর দীর্ঘশ্বাস, আর আটকে থাকা সময়।

পারিবারিক গল্প বলার সাহস ও সক্ষমতা
তানিম নূরকে আমরা বহুদিন ধরে চিনি থ্রিলারের নির্মাতা হিসেবে। ‘মানি হানি’, ‘কন্ট্রাক্ট’ কিংবা ‘কাইজার’ তারই প্রমাণ। তবে ‘উৎসব’-এ এসে তিনি যেন নির্মাণ করেছেন নিজের মনের ভেতরের সিনেমা—একটি গভীর পারিবারিক কাহিনি, যা সহজ অথচ ব্যথাবহ। নব্বই দশকের টিভি নাটকের ঘ্রাণমাখা আবহ, হালকা হাস্যরসের ছোঁয়া, আর আবেগে মোড়া মুহূর্তে সিনেমাটি হয়ে ওঠে আপনজনের মতো।

চরিত্রেরা যেন পাশের বাড়ির কেউ
তারিক আনাম খান থেকে শুরু করে জাহিদ হাসান, আফসানা মিমি, জয়া আহসান, অপি করিম, চঞ্চল চৌধুরী, আজাদ আবুল কালাম, ইন্তেখাব দিনার, সুনেরাহ, সৌম্য জ্যোতি, সাদিয়া আয়মান—সবাই যেন চরিত্র নয়, বাস্তবের মানুষ। তবে নিঃসন্দেহে সিনেমার প্রাণ জাহিদ হাসান। ‘আমলনামা’র পর তিনি যেন ফিরে পেলেন নিজের জায়গা। কিপটেমি, রাগ, হতাশা—সব কিছুতে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ। চঞ্চল-জয়া-অপি এই ট্রিপল স্পেশাল ক্যামিওতেও দিয়েছে সিনেমাকে প্রয়োজনীয় ড্রামা ও স্মার্টনেস।

সিনেমাজুড়েই কখনো ‘হাওয়া’ বা ‘আয়নাবাজি’ সিনেমা, বৃন্দাবন দাসের নাটক, অভিনেতা আ খ ম হাসান, মোশাররফ করিম, আফরান নিশোকে মনে করিয়েছেন নির্মাতা। এ সময় আর সেই সময়ের খুঁটিনাটি সবকিছুর দিকে খেয়াল রেখেছেন; চিত্রনাট্যের পরতে পরতে আবেগের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন মজা।

নব্বইয়ের প্রতি নিখাদ প্রেম ও সম্মান
‘উৎসব’ শুধু একটি গল্প নয়, এটি এক যুগের প্রতি ভালোবাসার চিঠি। এইচ১০০ মোটরবাইক, ভিডিও ক্যাসেট, ‘দিলওয়ালে’, ‘রাজা হিন্দুস্তানি’, ‘আজ রবিবার’—সিনেমা আর নাটকের নামগুলো নিছক রেফারেন্স নয়, এগুলো একেকটি টেক্সচার, যা আমাদের নস্টালজিয়ায় রঙ লাগায়। সব মিলিয়ে উৎসব যেন নব্বইয়ের পপ কালচারের প্রতি ট্রিবিউট। মধুমিতা হল, বিহারি সম্প্রদায়ের জীবনের টুকরো, এমনকি ভুল ভিডিও ক্যাসেট দেওয়ার মজার ঘটনাও সেই সময়কে জীবন্ত করে।

কারিগরি মুন্সিয়ানা ও কিছু অতৃপ্তি
রাশেদ জামানের ক্যামেরা নিঃসন্দেহে সিনেমার অন্যতম সম্পদ। গান, দৃশ্য, আবহ সবখানেই তিনি চিত্রভাষায় গল্প বলেছেন। গান ‘তুমি’ আর ‘ধূসর সময়’ চিত্রায়ণে আভিজাত্য ছিল। তবে কিছু জায়গায় বাজেটের সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে, বিশেষ করে শেষের গানটির আয়োজন আরও সমৃদ্ধ হতে পারত।

সিনেমা, সময়, উপলব্ধি
‘উৎসব’ যেন এক দেরিতে আসা চিঠি, যা সময়মতোই পৌঁছেছে। সবাই জীবনের কোনো না কোনো ধাপে একবার করে ‘জাহাঙ্গীর’ হয়ে পড়ে। হয়তো তখন চারপাশের কারও চিৎকার বিরক্ত করে, কারও ভালোবাসা বোঝা হয়ে ওঠে না, অথবা কোনো ভুল বলে ফেলি যা সংশোধনের সুযোগ আর পাই না।

‘উৎসব’ সেই ভুলের মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায়। পুরোনো ক্ষতকে সেলাই করার সাহস জোগায়।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই সিনেমা মনে করিয়ে দেয়, জীবন যতই কৃপণ হোক, ভালোবাসা কখনো কিপটেমি করে না।

উৎসবের শেষ দৃশ্যে অবচেতন মনে নির্মাতার তরফ থেকে যেন একটা ফোনকল বেজে ওঠে—
‘হ্যালো, নাইনটিজ… কাম ব্যাক। তোমাকে আমাদের এখনো খুব দরকার।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ০৫:১৩:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫ ৩২৯ বার পড়া হয়েছে

পরিবার ছাড়া দেখা নিষেধ ‘উৎসব’ নিয়ে কেন এত মাতামাতি

আপডেট সময় : ০৫:১৩:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫

মোহাম্মদপুরের পুরোনো অলিগলি, চেনা মুখের ভিড়, হারিয়ে যাওয়া ট্রেনের হুইসেল, আর সেই চিরচেনা পারিবারিক টানাপোড়েন—‘উৎসব’ যেন আমাদের অনেকেরই ফেলে আসা শৈশবের ফ্রেমবন্দি সিনেমা।

চার্লস ডিকেন্সের কালজয়ী ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’–এর দেশি রূপান্তর বলা হলেও, তানিম নূরের এই চলচ্চিত্র ঠিক এক লাইনে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি একসঙ্গে আফসোসের স্বীকারোক্তি, প্রাপ্তির উষ্ণতা এবং নতুন করে বাঁচার উপলক্ষ।

একটি মৃত্যু, উপলব্ধি, এক জীবনের মোড় পরিবর্তন
গল্পের শুরু চাঁদরাতের চিরচেনা ব্যস্ততা দিয়ে। শান্তি নীড়ে চলেছে ঈদের প্রস্তুতি, মোবারক সাহেব (তারিক আনাম খান) প্রতিবারের মতো গাইছেন ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। কিন্তু এবার গান শেষ হয় না, তার জীবনটাই শেষ হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় আবির্ভাব ঘটে কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহাঙ্গীরের (জাহিদ হাসান)। তাকে আপনি চিনে ফেলবেন—এমন আত্মকেন্দ্রিক মানুষ প্রায় সব পরিবারেই একজন থাকেন। উৎসব কমিউনিটি সেন্টারের কিপটে কর্ণধার, শিশুদের গানে বিরক্ত হয়ে পুলিশ ডাকার মতো অসহিষ্ণু, এমনকি বিড়ালের দৌরাত্ম্যেও রাগে ফেটে পড়েন। তাই আশপাশের মানুষ তাকে ডাকে ‘খাইষ্টা জাহাঙ্গীর’ নামে।

কিন্তু মোবারকের মৃত্যুর রাতেই বদলে যেতে থাকে সবকিছু। অতীতের ভূতরা (চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান, অপি করিম) হাজির হয় জাহাঙ্গীরের জীবনে। তার জীবন সিনেমার মতো খুলে পড়ে—যেখানে আছে অপ্রাপ্তি, ভুল, ভালোবাসা হারানোর দীর্ঘশ্বাস, আর আটকে থাকা সময়।

পারিবারিক গল্প বলার সাহস ও সক্ষমতা
তানিম নূরকে আমরা বহুদিন ধরে চিনি থ্রিলারের নির্মাতা হিসেবে। ‘মানি হানি’, ‘কন্ট্রাক্ট’ কিংবা ‘কাইজার’ তারই প্রমাণ। তবে ‘উৎসব’-এ এসে তিনি যেন নির্মাণ করেছেন নিজের মনের ভেতরের সিনেমা—একটি গভীর পারিবারিক কাহিনি, যা সহজ অথচ ব্যথাবহ। নব্বই দশকের টিভি নাটকের ঘ্রাণমাখা আবহ, হালকা হাস্যরসের ছোঁয়া, আর আবেগে মোড়া মুহূর্তে সিনেমাটি হয়ে ওঠে আপনজনের মতো।

চরিত্রেরা যেন পাশের বাড়ির কেউ
তারিক আনাম খান থেকে শুরু করে জাহিদ হাসান, আফসানা মিমি, জয়া আহসান, অপি করিম, চঞ্চল চৌধুরী, আজাদ আবুল কালাম, ইন্তেখাব দিনার, সুনেরাহ, সৌম্য জ্যোতি, সাদিয়া আয়মান—সবাই যেন চরিত্র নয়, বাস্তবের মানুষ। তবে নিঃসন্দেহে সিনেমার প্রাণ জাহিদ হাসান। ‘আমলনামা’র পর তিনি যেন ফিরে পেলেন নিজের জায়গা। কিপটেমি, রাগ, হতাশা—সব কিছুতে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ। চঞ্চল-জয়া-অপি এই ট্রিপল স্পেশাল ক্যামিওতেও দিয়েছে সিনেমাকে প্রয়োজনীয় ড্রামা ও স্মার্টনেস।

সিনেমাজুড়েই কখনো ‘হাওয়া’ বা ‘আয়নাবাজি’ সিনেমা, বৃন্দাবন দাসের নাটক, অভিনেতা আ খ ম হাসান, মোশাররফ করিম, আফরান নিশোকে মনে করিয়েছেন নির্মাতা। এ সময় আর সেই সময়ের খুঁটিনাটি সবকিছুর দিকে খেয়াল রেখেছেন; চিত্রনাট্যের পরতে পরতে আবেগের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন মজা।

নব্বইয়ের প্রতি নিখাদ প্রেম ও সম্মান
‘উৎসব’ শুধু একটি গল্প নয়, এটি এক যুগের প্রতি ভালোবাসার চিঠি। এইচ১০০ মোটরবাইক, ভিডিও ক্যাসেট, ‘দিলওয়ালে’, ‘রাজা হিন্দুস্তানি’, ‘আজ রবিবার’—সিনেমা আর নাটকের নামগুলো নিছক রেফারেন্স নয়, এগুলো একেকটি টেক্সচার, যা আমাদের নস্টালজিয়ায় রঙ লাগায়। সব মিলিয়ে উৎসব যেন নব্বইয়ের পপ কালচারের প্রতি ট্রিবিউট। মধুমিতা হল, বিহারি সম্প্রদায়ের জীবনের টুকরো, এমনকি ভুল ভিডিও ক্যাসেট দেওয়ার মজার ঘটনাও সেই সময়কে জীবন্ত করে।

কারিগরি মুন্সিয়ানা ও কিছু অতৃপ্তি
রাশেদ জামানের ক্যামেরা নিঃসন্দেহে সিনেমার অন্যতম সম্পদ। গান, দৃশ্য, আবহ সবখানেই তিনি চিত্রভাষায় গল্প বলেছেন। গান ‘তুমি’ আর ‘ধূসর সময়’ চিত্রায়ণে আভিজাত্য ছিল। তবে কিছু জায়গায় বাজেটের সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে, বিশেষ করে শেষের গানটির আয়োজন আরও সমৃদ্ধ হতে পারত।

সিনেমা, সময়, উপলব্ধি
‘উৎসব’ যেন এক দেরিতে আসা চিঠি, যা সময়মতোই পৌঁছেছে। সবাই জীবনের কোনো না কোনো ধাপে একবার করে ‘জাহাঙ্গীর’ হয়ে পড়ে। হয়তো তখন চারপাশের কারও চিৎকার বিরক্ত করে, কারও ভালোবাসা বোঝা হয়ে ওঠে না, অথবা কোনো ভুল বলে ফেলি যা সংশোধনের সুযোগ আর পাই না।

‘উৎসব’ সেই ভুলের মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায়। পুরোনো ক্ষতকে সেলাই করার সাহস জোগায়।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই সিনেমা মনে করিয়ে দেয়, জীবন যতই কৃপণ হোক, ভালোবাসা কখনো কিপটেমি করে না।

উৎসবের শেষ দৃশ্যে অবচেতন মনে নির্মাতার তরফ থেকে যেন একটা ফোনকল বেজে ওঠে—
‘হ্যালো, নাইনটিজ… কাম ব্যাক। তোমাকে আমাদের এখনো খুব দরকার।’