বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে মাঠে কৃষিকাজ করার সময় বজ্রপাতে বিধান বাছাড় ও মানিক বাছাড় নামের দুই আপন ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।..
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার শৌলখালী গ্রামে বুধবার দুপুরে বজ্রপাতে দুই সহোদর কৃষকের মৃত্যুর ঘটনাটি স্থানীয় জনজীবনে গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছে। নিহতরা হলেন ওই গ্রামের মনিরঞ্জন বাছাড়ের দুই ছেলে বিধান বাছাড় (৫৫) ও মানিক বাছাড় (৪০)। ঘটনার দিন দুপুরে তারা উপজেলার মহিষপুরা পুলিশ ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী মাঠে নিজেদের জমিতে কৃষিকাজে ব্যস্ত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ার পর হঠাৎ করেই বজ্রপাত শুরু হয় এবং কোনো সতর্ক সংকেত পাওয়ার আগেই বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই দুই ভাইয়ের মৃত্যু ঘটে। মোরেলগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শহিদুল্লাহ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মাঠের খোলা জায়গায় কাজ করার সময় প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর খেলায় দুই ভাইয়ের প্রাণহানি ঘটে, যা পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করলেও ততক্ষণে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন।
দুই সহোদরের অকাল মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এক গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে গ্রামীণ পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং খোলা মাঠে কাজ করার সময় সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত সাধারণ কৃষকরা এ ধরনের প্রাণঘাতী পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়রা বলছেন, বিধান ও মানিক বাছাড় অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন এবং পরিবারের হাল ধরতে তারা নিয়মিত মাঠে কাজ করতেন। তাদের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে ওই পরিবারটি এখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। মাঠের কাজের সময় বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য কোনো আশ্রয়কেন্দ্র বা আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে, যা তাদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতা মেহেদী হাসান ইয়াদ নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন এবং ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে দলীয়ভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে, মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ জানিয়েছেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, নিহতদের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা, যাতে শোকার্ত পরিবারটি অন্তত মানসিকভাবে কিছুটা ভরসা পায়।
বজ্রপাত এখন বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, বিশেষ করে কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুই সহোদরের এই মৃত্যু প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিক বজ্রপাত কৃষকদের জীবনযাত্রার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র স্থাপন এবং কৃষকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জোরালো হচ্ছে। প্রকৃতির এই চরম আঘাতের বিপরীতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে গ্রামীণ জনপদে কৃষকদের প্রাণহানি রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির জন্যও একটি বড় অশনি সংকেত।