নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ১০১ একরের ক্যাম্পাসে এমন কিছু জায়গা আছে, যেগুলো শুধু চোখে দেখা যায় না—অনুভব করা যায়। তেমনই এক জায়গা নীলদিঘী। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ভবন ও একাডেমিক ভবন-৩-এর পাশে থাকা এই দিঘীটি শিক্ষার্থীদের কাছে কেবল জলাশয় নয়; বরং আড্ডা, স্বস্তি, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পরিচিত ঠিকানা।
সকাল গড়িয়ে দুপুর। ক্লাসের ব্যস্ততার মাঝেও নীলদিঘীর পাড়ে দেখা মেলে শিক্ষার্থীদের। কেউ বেঞ্চে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছেন, কেউ নীরবে তাকিয়ে আছেন দিঘীর জলের দিকে। চারপাশে থাকা গাছের ছায়ায় বসে ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা একাডেমিক ব্যস্ততার চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে অনেকেই ছুটে আসেন এখানে। দিঘীর চারপাশে রয়েছে প্রায় ৩০টির মতো বসার বেঞ্চ। দুপুরের পর বাড়তে থাকে আনাগোনা, আর বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটি যেন ফিরে পায় তার পূর্ণ প্রাণ।
নীলদিঘীর উত্তর পাড়ের সিঁড়িগুলোতেও জমে নানা গল্প। কখনো একসঙ্গে বসে জুনিয়রদের সঙ্গে কথা বলেন সিনিয়ররা, দেন বিশ্ববিদ্যালয়জীবন নিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ। কখনো সেখানে চলে বন্ধুদের আড্ডা, ছবি তোলা কিংবা নিছক কিছুক্ষণ পাশাপাশি বসে থাকা। সম্প্রতি দিঘীর সামনের ঘাটে নতুন করে ছাদযুক্ত ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের বসা ও সময় কাটানোর জায়গাটিতে যুক্ত করেছে নতুন একটি মাত্রা। আবার বিকেলের নরম আলোয় দিঘীর পাড় হয়ে ওঠে একান্ত সময় কাটানোরও জায়গা।
ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিক্স বিভাগের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমাম হোসেন ইমন বলেন, “নীলদিঘীর শান্ত পরিবেশ আর পানির স্থিরতা মনের ক্লান্তি অনেকটাই দূর করে দেয়। সারাদিনের পড়াশোনা ও ব্যস্ততার পর এখানে কিছুক্ষণ বসলে অন্যরকম একটা প্রশান্তি পাওয়া যায়। চারপাশের প্রকৃতি আর নিরিবিলি পরিবেশটাও মনকে স্বস্তি দেয়।”
শুধু আড্ডা নয়, শিক্ষার্থীদের নানা আয়োজনেরও সাক্ষী এই নীলদিঘী। বিভিন্ন ব্যাচের চড়ুইভাতি, জন্মদিন উদযাপন, বারবিকিউ কিংবা ছোট পরিসরের সাংস্কৃতিক আয়োজন—তারুণ্যের নানা মুহূর্তে জায়গাটি হয়ে ওঠে মিলনমেলা। বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলা শেষে অনেক শিক্ষার্থী নীলদিঘীর পাড়ে এসে সময় কাটান; কেউ কেউ পানিতে নেমেও আনন্দ করেন। খেলার পর বন্ধুদের সঙ্গে এমন মুহূর্তগুলোও হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসজীবনের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের অংশ।
নিজের দীর্ঘদিনের ক্যাম্পাসজীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, “শিক্ষার্থীরা যখন সারাদিনের ক্লাস ও পরীক্ষার ক্লান্তি শেষে নীলদিঘীর পাড়ে এসে বসে, তখন নিমিষেই যেন অনেকটা স্বস্তি ফিরে পায়। তবে সম্প্রতি বহিরাগতদের আনাগোনা এবং কিছু শিক্ষার্থীর অনাকাঙ্ক্ষিত আড্ডার কারণে জায়গাটির পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ ধরে রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
প্রকৃতির সৌন্দর্যও নীলদিঘীকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়। চারপাশে থাকা নানা গাছের মধ্যে সারি সারি নারিকেলগাছ দিঘীর পরিবেশে যোগ করেছে আলাদা সৌন্দর্য। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা আলো, দিঘীর জলে আকাশের প্রতিবিম্ব, চারপাশের সবুজ আর পাখির কলকাকলি—সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় এক স্বস্তির আবহ। বিশেষ করে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সময় বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। ব্যস্ত ক্যাম্পাসের মধ্যেও তখন কিছুটা থমকে থাকার সুযোগ মেলে।
এই পরিবেশের কারণেই নীলদিঘী অনেকের কাছে শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক আবেগ। এখানে কেউ প্রথমবার নতুন বন্ধুর সঙ্গে গল্প করেছেন, কেউ কাটিয়েছেন ব্যাচের বিশেষ কোনো দিন, আবার কেউ হয়তো একা বসে নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়েছেন। ছোট ছোট এসব মুহূর্তই সময়ের সঙ্গে হয়ে ওঠে বড় স্মৃতি।
ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম বলেন, “আমার কাছে নোবিপ্রবির নীলদিঘী একটা জায়গা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটা অনুভূতি। এখানে কখনো বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে সময় কেটেছে, আবার কখনো নিজের সঙ্গে নিজেই কিছুটা সময় কাটিয়েছি। নীলদিঘীর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, এটা কথা বলে না, কিন্তু অনেক কথা শুনে। ক্লাসের ব্যস্ততা, পরীক্ষার চাপ, মন খারাপ কিংবা হঠাৎ পাওয়া কোনো ছোট্ট আনন্দ—সবকিছুরই নীরব সাক্ষী যেন এই দিঘী। নোবিপ্রবিতে অনেক জায়গা থাকলেও নীলদিঘীকে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি নীরব ডায়েরি মনে হয়, যার পাতায় লেখা থাকে অনেক গল্প, কিন্তু কোনো শব্দ নেই।”
সময় এগোয়, ব্যস্ততা বাড়ে, একসময় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনও শেষ হয়ে যায়। আজ যে শিক্ষার্থীরা নীলদিঘীর বেঞ্চে বসে গল্প করছেন, কয়েক বছর পর হয়তো তারা ছড়িয়ে পড়বেন দেশের নানা প্রান্তে। বদলে যাবে মুখ, আসবে নতুন ব্যাচ, নতুন বন্ধুত্ব আর নতুন গল্প। কিন্তু পুরোনোদের স্মৃতিতে থেকে যাবে কোনো এক বিকেল, কোনো এক আড্ডা, বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া খাবার কিংবা দিঘীর পাড়ে কাটানো নিঃশব্দ কিছু মুহূর্ত।
তাই নীলদিঘী শুধু একটি দিঘী নয়। এটি নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার নীরব সাক্ষী, তারুণ্যের অসংখ্য গল্পের সংরক্ষণাগার। ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার পরও হয়তো অনেকের মনে হঠাৎ ফিরে আসবে সেই পরিচিত জল, সেই বেঞ্চ আর সেই বিকেলের কথা। আর তখন নীলদিঘী হয়ে থাকবে—এক টুকরো ক্যাম্পাস, একখণ্ড স্মৃতি, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সেই নীরব ডায়েরি।