নীলফামারী খাদ্যগুদামের (এলএসডি) ধান, চাল ও গম লোড-আনলোডের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের সরকার নির্ধারিত মজুরির চেয়ে কম টাকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘খালেক এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবের স্বাক্ষর করা চেক, ডেবিট/এটিএম কার্ড ও পিন নম্বর ঠিকাদারপক্ষের কাছে আটকে রাখার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। সরকারি বরাদ্দের টাকা ব্যাংক থেকে তুলে শ্রমিকদের কম টাকা দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের।

এসব অভিযোগের প্রতিকার ও সরকার নির্ধারিত মজুরি আদায়ের দাবিতে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন এলএসডির প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক। পরে তাঁরা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নুসরাত তাসনীম আওনের কাছে স্মারকলিপি দেন।

শ্রমিকদের দেওয়া লিখিত আবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চালের বস্তা গুদামে আনা-নেওয়ার কাজে প্রতি টনে ১৫০ টাকা মজুরি নির্ধারিত থাকলেও তাঁদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪৭ টাকা। একইভাবে ধানের লেবারি বাবদ প্রতি টনে ২৫০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন।

আবেদনে আরও বলা হয়, শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধের জন্য ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে হিসাব খোলা হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার এ.টি.এম. খালেকুর জামান শ্রমিকদের স্বাক্ষর করা চেক, ডেবিট/এটিএম কার্ড ও পিন নম্বর নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। পরে ব্যাংক থেকে সরকারি বরাদ্দের টাকা তুলে শ্রমিকদের হাতে নির্ধারিত মজুরির তুলনায় কম টাকা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শ্রমিকরা বলেন, তাঁরা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে এলএসডিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। বয়স ও দীর্ঘদিনের পেশাগত বাস্তবতার কারণে এখন অন্য কোনো কাজে যাওয়ার সুযোগও নেই। অথচ সরকারি নির্ধারিত মজুরি না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, ন্যায্য মজুরি ও ব্যাংকের চেক-এটিএম কার্ড ফেরত চাইলে তাঁদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি মারধর ও কাজ থেকে বাদ দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। লিখিত আবেদনে এ ধরনের অভিযোগের ঘটনায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মো. শহিদুল ইসলাম, মো. দেলদার আলী, মো. মমেদুল ইসলাম, মো. মজিদুল ইসলাম, মো. রহমত আলী ও মো. বেলাল হোসেন।

শ্রমিক তহিদুল বলেন, ‘আমরা দিনমজুর মানুষ। শ্রমের ন্যায্য মজুরি না পেলে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। মজুরি নিয়ে কথা বললেই কাজ হারানোর ভয় দেখানো হয়।’
দুলাল হোসেন বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত মজুরি কত এবং আমরা কত পাচ্ছি, কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আমরা আমাদের ন্যায্য পাওনা চাই।’

আজিজুলের অভিযোগ, ‘আমাদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হলেও চেক ও এটিএম কার্ড অন্যের কাছে থাকায় নিজেদের টাকা নিজেরা তুলতে পারছি না। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
বাবুল হোসেন বলেন, ন্যায্য মজুরি ও ব্যাংক কার্ড ফেরত চাইলে তাঁদের ভয় দেখানো হয়। তিনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত মজুরি পরিশোধের দাবি জানান।

মোশারফ হোসেন বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এলএসডিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। মজুরি নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
দুলু মিয়ার ভাষ্য, ‘আমরা কোনো বিরোধ চাই না। সরকার যে মজুরি নির্ধারণ করেছে, সেই অনুযায়ী শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হোক।’

শ্রমিকদের আবেদনে অভিযোগগুলো তদন্ত করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, শ্রমিকদের চেক ও এটিএম কার্ড ফেরত দেওয়া এবং সরকার নির্ধারিত পূর্ণাঙ্গ মজুরি সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবে বা হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘খালেক এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী এ.টি.এম. খালেকুর জামানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, তোমরা যা খুশি লিখো। এবিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।