জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৬৫ হাজার ৫১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের ১৬টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫): সাউদার্ন রুট। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ২৫ হাজার ২৭৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। প্রকল্প ঋণ থেকে আসবে ৪০ হাজার ১৬৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন বা অন্যান্য উৎস থেকে আসবে আরও ৭২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নতুন ১২টি এবং সংশোধিত চারটি।

মেট্রোরেল-৫ প্রকল্পে ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা

এবারের একনেক সভায় সবচেয়ে বড় প্রকল্প ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫): সাউদার্ন রুট। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ এবং প্রকল্প ঋণ ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে।

রেল খাতে দুটি বড় প্রকল্প

বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনে ব্যয় বাড়ছে ৪ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। মূল প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধন ও বিশেষ সংশোধনের পর প্রকল্পটির ব্যয় ও অর্থায়ন কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। জুলাই ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর ২০৩০ পর্যন্ত এর বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর প্রকল্পে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৯৪২ কোটি ৯ লাখ এবং প্রকল্প ঋণ ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও সড়ক খাতেও বড় বরাদ্দ

যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডস ও ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় ‘ইন্টিগ্রেটেড হেলথ সিস্টেম রেসপন্স টু ফাইট এগেইনস্ট টিবি, এইচআইভি/এইডস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৩৯ কোটি ৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৩ হাজার ১৬৮ কোটি ৮৯ লাখ এবং প্রকল্প ঋণ ৮৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি প্রকল্প ‘হেলথ সিস্টেম স্ট্রেনদেনিং থ্রু এমএনসিএইচ সার্ভিসেস ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড এনসিডিস কন্ট্রোল’-এ ব্যয় হবে ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৭৫ কোটি ৭৮ লাখ এবং প্রকল্প ঋণ ৩২১ কোটি ৩ লাখ টাকা।

সড়ক খাতের দুটি নতুন প্রকল্পও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। রাজশাহী সড়ক জোনের আওতায় জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীত করতে ব্যয় হবে ৯৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতায় জেলা মহাসড়ক উন্নয়নের তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

প্রতিরক্ষা ও আর্থিক খাত

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মধ্যে বরিশাল সেনানিবাস স্থাপনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে ব্যয় হবে ১ হাজার ১৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসন সুবিধাসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে ৩৭৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। দুটি প্রকল্পেই সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে।

আর্থিক খাতের ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’-এ ব্যয় হবে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ এবং ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে।

পানি সম্পদ ও অন্যান্য প্রকল্প

ছোট ফেনী ও বামনী নদী অববাহিকায় সমন্বিত বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নে মুসাপুর রেগুলেটর নির্মাণসহ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৭৫১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা রক্ষায় ব্যয় হবে ৬০৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এ ছাড়া খুলনা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম সংশোধন, মনপুরা দ্বীপাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধন এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের মাধ্যমে তিনটি সিটি করপোরেশন, একটি পৌরসভা ও দুটি গ্রামীণ উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি স্থাপনের প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।

তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়নে নতুন ‘দ্য ইমপ্রুভড ওয়ার্কিং কন্ডিশন অ্যান্ড সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ওয়ার্কার্স ইন দ্য টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার সেক্টর’ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

৫০ কোটি টাকার কমের আরও ১৫ প্রকল্প

একনেক সভায় ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও ১৫টি প্রকল্পের বিষয়েও অবহিত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়করণ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর নির্মাণ, ভাসানচরে সবুজ বেষ্টনী ও কক্সবাজারে বন পুনঃস্থাপন, দেশি মুরগি গবেষণা ও সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন, সিলেট বিভাগের ডিজিটাল এলিভেশন মডেল তৈরি এবং সিলেট-১০ নম্বর অনুসন্ধান কূপ খননসহ বিভিন্ন প্রকল্প।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় একনেক সভা হতে যাচ্ছে এটি। এর আগে গত ১৩ মে সবচেয়ে বড় একনেক সভায় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের নয়টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ওই সভায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পও অনুমোদন পায়।

প্রস্তাবিত ৬৫ হাজার ৫১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকার ১৬টি প্রকল্প অনুমোদন পেলে আকারের দিক থেকে এটিই হবে বিএনপি সরকারের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় একনেক সভা।