নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নবীন বরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন অডিটোরিয়ামে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. শাহজাহান (এমপি)। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় সংগীত পরিবেশন, পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। এরপর নবীন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ নবীন শিক্ষার্থীদের উষ্ণ অভিনন্দন জ্ঞাপন করে বলেন, দীর্ঘদিনের অধ্যাবসায়, ত্যাগ এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে তোমরা এখানে আসার সুযোগ পেয়েছো। বিশ্ববিদ্যালয় তোমাদের শুধু ডিগ্রি প্রদান করবে না, এখানে তোমরা শিখবে কিভাবে ভিন্নমতকে সম্মান জানাতে হয় এবং দেশের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে হয়। সময়ের বরপুত্র হয়ে তোমাদের নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই গড়ে তুলতে হবে। এখানে অনেক বাস্তবতা ও নতুন অভিজ্ঞতা আসবে, কিন্তু জ্ঞান অর্জন থেকে কখনও দূরে সরে আসবে না। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করছে। যার বাস্তব প্রয়োগ আমরা এবারের বাজেটে দেখেছি। তোমরা জ্ঞান এবং সৃজনশীলতা দিয়ে বাংলাদেশকে আলোকিত করবে, যেনো তোমাদের দ্যুতি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে শিক্ষকদের আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে এবং ব্যাপকভাবে গবেষণাতে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে হবে, যেনো তা মানুষের কল্যাণে কাজে আসে। একই সঙ্গে শিক্ষকতাকে শুধূমাত্র ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কাজে লাগাতে হবে। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাদামাটা জীবনযাপনের কথা উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের তা অনুসরণের আহ্বান জানান এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এ স্লোগানকে পাথেয় করে জুলাইয়ের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

গেস্ট অব অনারের বক্তব্যে নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান (এমপি) বলেন, আজকের এই দিনে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশের তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। যিনি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আজকের এই মূহুর্তটি অত্যন্ত আনন্দঘন, কারণ স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে তোমরা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গণে পা রেখেছো। এ সময় সংসদ সদস্য আরও বলেন, আমরা এ অঞ্চলে সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট গড়ে তুলবো যেখানে এমন সব গবেষক তৈরী হবে যারা সমুদ্রের অবারিত সম্পদকে আবিষ্কারের পাশাপাশি আহরণের পথ দেখিয়ে দেবে। সোনাপুরের দক্ষিণে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে। ১০০ একরের এই ক্যাম্পাসের পাশাপাশি আরও একশত থেকে দেড়শত একরের ক্যাম্পাস গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অল্প দিনের মধ্যেই ক্যাম্পাসের সামনের রাস্তাকে চার লেন করার কাজ শুরু করা হবে এবং সোনাপুর রেলওয়েকে আরও দক্ষিণে সম্প্রসারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় নতুন একটি রেল স্টেশন করা হবে। আর এই কাজগুলো করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে তোমাদের শিক্ষার্থীদেরকেই। সেই দিন বেশি দূরে নয় যেদিন বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তোমরা যারা নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি অগ্রসরমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছ তাদের আন্তরিক অভিনন্দন। নোবিপ্রবি বর্তমানে র‌্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছে। যা নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে নানা ধরনের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে কর্মসংস্থান, মানব সম্পদ উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অনেক বাধা বিপত্তির পরও শিক্ষাখাতের বাজেট দুই শতাংশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হবে। এ সময় তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করলে হবে না, তাদের চাকরি দেওয়ার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত ধারণা ও প্রযুক্তি শিল্পে প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করতে হবে। তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী কাজে যুক্ত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণায় সহায়তার জন্য ৫০০ কোটি টাকার তহবিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও ৮০০ কোটি টাকার তহবিলের উদ্যোগ রয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নে ইউজিসির তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, নবীন শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে নোবিপ্রবিকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়; এটি মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। শিক্ষার পরিবেশকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রাখার পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল কর্মকা-ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুন্ন রাখবে। উপাচার্য আরও বলেন, নোবিপ্রবিতে বর্তমানে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে বেশকিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একাডেমিক ভবন-৩-এর নির্মাণকাজ শিগগিরই শুরু হবে। পাঁচটি আবাসিক হলে ওয়াই-ফাই সংযোগের কাজ শুরু হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক সংকট নিরসনে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পরিবহন সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু বাস সংযোজন করা হয়েছে এবং আরও কিছু বাস যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন ৪টি হল নির্মাণের জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউট ও সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ করে ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. হাছান উদ্দীন, নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক জনাব মো. হারুনুর রশিদ আজাদ, নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিন। অন্যান্যের মাঝে বক্তব্য রাখেন নোবিপ্রবি বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মহিনুজ্জামান, আবদুল মালেক উকিল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ, নোয়াখালী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জনাব মাহবুব আলমগীর আলো, নোয়াখালী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর জনাব ইসহাক খন্দকার। নবীন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের নুছরাত শরীফ সাবিহা ও বিবিএ বিভাগের নজরুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. ইউসূফ শেখ ও জান্নাতুল ফেরদৌস ইরা। নবীন বরণে অন্যান্যের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, হল প্রভোস্ট, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।