বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। একই বৈঠকে কাতার থেকে অতিরিক্ত এক কার্গো এলএনজি, টিসিবির জন্য ১০ হাজার টন মসুর ডাল এবং বিভিন্ন উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের ক্রয় প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জিটুজি পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ৫০:৫০ অনুপাতে জ্বালানি তেল আমদানির শর্ত শিথিলের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য নেগোসিয়েশনে সম্মত প্রিমিয়াম, পরিমাণ ও বর্তমান রেফারেন্স প্রাইস অনুযায়ী ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।

সুপারিশকৃত দরদাতাদের মধ্যে রয়েছে চীনের ইউনিপেক ও পেট্রোচায়না এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেলের মোট চুক্তিমূল্য ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

এ ছাড়া কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আগামী ১০ নভেম্বর একটি অতিরিক্ত এলএনজি কার্গো কেনার দর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এলএনজির একক দর নির্ধারণ করা হয়েছে জেকেএমের চেয়ে শূন্য দশমিক শূন্য ২ মার্কিন ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্ডধারী নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য ১০ হাজার টন মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্তও হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

যমুনা নদীর তীর রক্ষায় টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় ১ হাজার ৬২৫ মিটার নদীতীর সংরক্ষণকাজে ১৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের একটি নির্মাণকাজে ব্যয় ৬১ কোটি ৬৯ লাখ ৯৫ হাজার ৫৭৩ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরংয়ে আরসিসি জেটি ও আনুষঙ্গিক স্থাপনা নির্মাণে ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।

পিপিপিতে চালু হবে দুই টেক্সটাইল মিল

অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির একই দিনের বৈঠকে নীলফামারীর দারোয়ানী ও মাগুরা টেক্সটাইল মিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে পুনরায় চালুর জন্য বেসরকারি অংশীদারের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ২৫টি মিলের মধ্যে ১৬টি পিপিপিতে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে বেসরকারি অংশীদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

৩৭ দশমিক ৮৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলটি ১৯৮০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। এটি পুনরায় চালুর জন্য ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রডাক্টস বিডি লিমিটেডকে পছন্দের দরদাতা করা হয়েছে। ৩০ বছরের চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটি এককালীন ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা সাইনিং মানি দেবে। তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে মাসে ১২ লাখ ৯১ হাজার ৬৬৭ টাকা কন্ট্রাক্ট ফি দেওয়ার পাশাপাশি ৭৫ লাখ টাকা ডেভেলপমেন্ট ফি ও ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে।

মিলটিতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে ১৬ দশমিক শূন্য ৬ একর জমির মাগুরা টেক্সটাইল মিলটি ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। এটি চালুর জন্য চর্কা টেক্সটাইল লিমিটেডকে পছন্দের দরদাতা করা হয়েছে। ৩০ বছরের চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটি ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সাইনিং মানি দেবে। তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে বছরে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা কন্ট্রাক্ট ফি দেওয়ার পাশাপাশি ৫০ লাখ টাকা ডেভেলপমেন্ট ফি ও ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে।

দুই মিলেই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

১০ লাখ ৭৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন

ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় চারটি পৃথক প্রস্তাবে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রাশিয়া থেকে বিএডিসির মাধ্যমে ৩৫ হাজার টন এমওপি সার আমদানিতে ব্যয় হবে ১৬৬ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। প্রতি টনের দাম পড়বে ৩৮৩ দশমিক ৮০ ডলার।

মরক্কোর ওসিপি থেকে দুটি পৃথক প্রস্তাবে ৮০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানিতে ব্যয় হবে ৮৭৪ কোটি ৭৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। প্রতি টনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৮৫ ডলার। এ ছাড়া ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ব্যয়ে সৌদি আরবের সাবিক থেকে বিসিআইসির জন্য ৪০ হাজার টন ইউরিয়া সার আমদানি করা হবে। প্রতি টনের দাম পড়বে ৩৯১ দশমিক ৬৬ ডলার।

এ ছাড়া স্থানীয় আমদানিকারকদের মাধ্যমে আরও ৯ লাখ ২০ হাজার টন সার আমদানির তিনটি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারে ১৯টি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ লাখ টন ডিএপি, ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ ডলারে ১৪টি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টন এমওপি এবং ১৫ কোটি ১২ লাখ ডলারে ১০টি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ লাখ টন টিএসপি সার কেনা হবে।