শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়—প্রকৃতির অপরূপ এক নৈসর্গিক জনপদ। পাহাড়, টিলা, বনভূমি, ঝরনা, ছড়া আর লাল মাটির বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি মিলে গারো পাহাড় দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এই পাহাড়ের পাদদেশেই গড়ে উঠেছে জেলার অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র গজনী অবকাশ।

ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার উত্তরে এবং শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গজনী অবকাশের অবস্থান। সরকারি পর্যটন তথ্যেও গজনীকে ঝিনাইগাতীর সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গারো পাহাড়ের প্রকৃত সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ এর উঁচু-নিচু টিলা, সবুজ বনানী, পাহাড়ি ছড়া ও ঝরনা। গজনী অবকাশকেন্দ্রে রয়েছে পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা ও ভাস্কর্য। রয়েছে লেকসহ পর্যটকদের বিনোদনের নানা ব্যবস্থা। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন।

গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের অন্যতম প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেই এখন দেখা দিয়েছে পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক চিত্র।

গারো পাহাড়ের বিভিন্ন ছড়া, ঝোড়া ও নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঝিনাইগাতীর গজনীসহ গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগ, অভিযান এবং পরিবেশগত ক্ষতির কথা উঠে এসেছে। বন বিভাগ গজনী এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু বহনের সময় কয়েকটি মিনি ট্রাক জব্দ করার কথাও জানিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ের বুক চিরে এবং ছড়া-ঝোড়া থেকে বালু-পাথর তুলে নেওয়ার ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন বদলে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও টিলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। পরিবেশবাদীরাও অপরিকল্পিত বালু-পাথর উত্তোলন ও গাছ কাটার কারণে গারো পাহাড়ের প্রতিবেশব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

তবে প্রশাসন ও বন বিভাগ জানিয়েছে, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্ট, জব্দ ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সরকারি ও সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে।

গারো পাহাড় শুধু একটি পর্যটন এলাকা নয়; এটি শেরপুরের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূপ্রকৃতি। তাই পাহাড়, বন, ছড়া ও ঝরনার স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি।

গজনীর সৌন্দর্য বাঁচাতে হলে শুধু পর্যটনকেন্দ্র সাজালেই হবে না—বাঁচাতে হবে তার চারপাশের পাহাড়, বন ও জলপ্রবাহ। আজ যে পাহাড় পর্যটকদের মুগ্ধ করছে, অব্যাহত অনিয়ন্ত্রিত বালু-পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো সেই পাহাড়ের স্বাভাবিক সৌন্দর্য আর আগের মতো দেখতে পাবে না।

গারো পাহাড় আমাদের সম্পদ, গজনী আমাদের সৌন্দর্য—এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব সবার।