ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে উপকূলীয় মানুষের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত বরগুনার টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনে নির্বিচারে গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের দাবি, মাত্র চার দিনে টেংরাগিরি ও নলবুনিয়া বনাঞ্চল থেকে প্রায় ৯০০ গাছ কেটে নিয়েছে একটি দুর্বৃত্ত চক্র।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে বনের গাছ কেটে পাচার করা হলেও বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়ে তা বন্ধ হচ্ছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো গাছ কাটার মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নে টেংরাগিরি বনাঞ্চলের অবস্থান। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত এই বনের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। একসময় এলাকাটি সুন্দরবনের অংশ ছিল। ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই এটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৭ সালে এর নামকরণ করা হয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল।
বনটিতে গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, করমচা, কেওয়া, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, রেইনট্রি, হেতাল, তাম্বুলকাটা ও গরানসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। পাশাপাশি কাঠবিড়ালি, বানর, সজারু, বুনো শূকর, কচ্ছপ, শিয়াল, বনমোরগ ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ নানা প্রাণীর বিচরণ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে টেংরাগিরি বনাঞ্চল এবং এর প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তরে শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন নলবুনিয়া বনাঞ্চলে গাছ কাটা শুরু হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই বনাঞ্চল থেকে প্রায় ৯০০ গাছ কাটা হয়েছে বলে তাদের দাবি। এর মধ্যে টেংরাগিরি থেকে প্রায় ৪০০ এবং নলবুনিয়া থেকে প্রায় ৫০০ গাছ কাটা হয়েছে। কাটা গাছের মধ্যে রেইনট্রি, কেওড়া, গেওয়া, ঝাউ ও জিলাপি গাছ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিফাত, বাবুল হাওলাদারসহ কয়েকজন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে গাছ কাটার মামলা দেওয়ার ভয় দেখান। এ কারণে অনেকে চোখের সামনে গাছ কাটা দেখেও প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।
সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চুও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, ‘গাছ কাটার সঙ্গে বন বিভাগের লোকজন জড়িত। তারা জড়িত না থাকলে এতদিন বসে চোরেরা গাছ কাটে, আর তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি?’ তিনি গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানান।
এলাকাবাসী জানান, চক্রটির সদস্যরা সাধারণত রাতের আঁধারে কাঠ পাচার করে। অনেক সময় গাছ কেটে বনের ভেতরেই ফেলে রাখে। পরে সুযোগ বুঝে সেগুলো সরিয়ে নেয়। চুরির প্রমাণ মুছে ফেলতে অনেক ক্ষেত্রে গাছের শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়।
তবে গাছ কাটার বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে দাবি করেছেন বন বিভাগের নলবুনিয়া বিট কর্মকর্তা মো. শাওন। তিনি বলেন, ‘গাছ কাটার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’ এরপর তিনি আর কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, চার দিনে টেংরাগিরি ও নলবুনিয়া বন থেকে ৯ শতাধিক গাছ কেটে ফেলার তথ্য তারা পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র বাতাসের বিরুদ্ধে এই বনাঞ্চল উপকূলীয় মানুষের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। নির্বিচারে গাছ কাটা অব্যাহত থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়বে।
আরিফুর রহমান আরও বলেন, বনের কাঁকড়া, গুইসাপ, বন্য শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণী শিকারের অভিযোগও তারা পেয়েছেন। তাঁর দাবি, বন বিভাগের কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে জানলেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
তবে বন বিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তারা সরেজমিনে গিয়ে অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছেন। এ ঘটনায় মামলাও করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন
গাছ কাটার অভিযোগ পাওয়ার পর ১৪ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মোহাম্মদ ইলিয়াসকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।
আবু জাফর মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) তদন্ত কমিটির চিঠি পেয়েছি। আগামী সপ্তাহে তদন্ত শুরু করব।’
ইউএনও অতীশ সরকার বলেন, ‘টেংরাগিরি ও নলবুনিয়া বনের গাছ কাটার খবর পেয়ে পাঁচজনকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তাদের দেওয়া প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’