গারো পাহাড়ের পাদদেশে সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলা। একদিকে পাহাড়, নদী-ঝরনা ও সবুজ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, অন্যদিকে সীমান্তবর্তী দুর্গম জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থানের সংকট। পর্যাপ্ত শিল্প-কারখানা ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় নিম্নআয়ের অনেক পরিবার জীবিকা নিয়ে চাপে রয়েছে। এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে সীমান্তকেন্দ্রিক মাদক চোরাচালানের সঙ্গে কিছু মানুষ জড়িয়ে পড়ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঝিনাইগাতীর সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় মাদক উদ্ধারের ঘটনাও ঘটছে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গোমড়া গ্রামের সীমান্ত এলাকা থেকে বিজিবি ভারতীয় ৪৯০টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও দুটি মোবাইল ফোন পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তের দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং জীবিকার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাদক কারবারিরা দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শেরপুর সীমান্তে কর্মহীন মানুষকে মাদক বহনের কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে।

কর্মসংস্থানের সংকট বড় চ্যালেঞ্জ

ঝিনাইগাতীতে শিল্প-কারখানা সীমিত হওয়ায় কৃষি, দিনমজুরি ও মৌসুমি শ্রমের ওপর অনেক পরিবারের নির্ভরতা রয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বালু উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ খাতে যুক্ত হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কর্মহীনতার সুযোগে কিছু মানুষ অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তবে কর্মসংস্থানের অভাবকে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা যায় না। মাদক ব্যবসার পেছনে সংঘবদ্ধ চক্র, চোরাচালানের নেটওয়ার্ক এবং সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সীমান্তজুড়ে নজরদারি ও অভিযান

মাদক ও চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি ও পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ভূঁইয়া জানিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে এবং সীমান্তে মাদক চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের সরকারি পোর্টালেও মাদকবিরোধী সরকারি হটলাইন ০১৯০৮৮৮৮৮৮৮ উল্লেখ রয়েছে।

বিকল্প কর্মসংস্থানই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ

সীমান্তের মানুষের জীবিকার সুযোগ বাড়ানো গেলে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব—এমন মত স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে ঝিনাইগাতীতে দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আগস্টে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ৩০ জনকে বিউটি ফিকেশন, ব্লক-বাটিক, সেলুন, ইলেকট্রিক হাউজ ওয়্যারিং, ওয়েল্ডিং, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, কাঠমিস্ত্রি ও অটো চার্জারসহ বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে উপকরণ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা—সীমান্ত এলাকার যুবকদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে ঋণ ও সহায়তা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান এবং বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানো হবে।

গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সীমান্তবর্তী পর্যটন সম্ভাবনা এবং কৃষি অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে বৈধ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, অন্যদিকে অপরাধী চক্রের প্রভাব বিস্তারের সুযোগও কমতে পারে।

সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মানুষের হাতে বৈধ ও স্থায়ী জীবিকার সুযোগ তুলে দেওয়া। কারণ শুধু অভিযান দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; সীমান্তের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।