আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে প্রায় ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা লোকসান করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করায় এ লোকসান হয়েছে বলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে।

মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বিপিসির লোকসান সমন্বয়ে নতুন করে ভর্তুকি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার থেকে নেওয়া বিপিসির ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় দেশের বাজারে সে অনুযায়ী দাম সমন্বয় করা হয়নি। এতে মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত বিপিসির লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

এর মধ্যে মার্চে ২ হাজার ২৪৮ কোটি, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২১ কোটি, জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি এবং জুলাইয়ে ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকায় বিপিসির লোকসানও চলমান রয়েছে। এ লোকসান সমন্বয়ের জন্য গত ১৭ আগস্ট বিপিসি ভর্তুকির আবেদন করে। এর আগে ২ জুলাই, ২৮ জুলাই ও ১৩ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বিপিসির জন্য ভর্তুকি দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ভর্তুকি পাওয়া যায়নি।

চিঠিতে আরও বলা হয়, জ্বালানি তেলের আমদানি মূল্য ও সরকার নির্ধারিত স্থানীয় বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যজনিত লোকসান সমন্বয়ের জন্য বিপিসিকে দেওয়া ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ঋণের দায় থেকে বিপিসিকে অব্যাহতি দিয়ে ডেট সার্ভিস লায়াবিলিটিজ (ডিএসএল) বই থেকে তা অবলোপনের (রাইট-অফ) ব্যবস্থার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে।

বিপিসির নথি অনুযায়ী, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও দেশে সে অনুযায়ী দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রির কারণে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তা পূরণে বিভিন্ন সময়ে বিপিসিকে ঋণ দেওয়া হয়। পরে এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরাসরি ঋণ ছিল ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং লোকসান সমন্বয়ের জন্য দেওয়া ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।

২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বিপিসির অনুকূলে দেওয়া এ ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করে। পরে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এনবিআরের পাওনা বকেয়া ভ্যাট পরিশোধ সাপেক্ষে বিষয়টি নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিপিসি ২ হাজার ৬০৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বকেয়া ভ্যাট পাঁচ কিস্তিতে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে পরিশোধ করে।

২০২১ সালের ৪ এপ্রিল আবারও ওই ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়। তবে এখনো বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

চিঠিতে বলা হয়েছে, লোকসান সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এ ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। এদিকে বিপিসি উদ্বৃত্ত তহবিল ও লভ্যাংশ হিসেবে মোট ১৬ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।

প্রস্তাবের সংযুক্তিতে বলা হয়, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে থাকায় বিপিসি মুনাফা করতে শুরু করে। এরপর সংস্থাটি সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের কাছে ৩০ হাজার ৮৭৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দেনা পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, ভ্যাট কর্তৃপক্ষের ৬০৩ কোটি টাকা এবং রিফাইনারি ইউনিটের জন্য জমি কেনায় ২৩৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সরকারকে লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থের সংস্থানও করতে হচ্ছে বিপিসিকে।