মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর চেয়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শি জিনপিংয়ের তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে দুই নেতা বৈঠক করেন। বৈঠকের পর ট্রাম্প এটিকে ‘দারুণ বৈঠক’ বলে অভিহিত করেন।

ইরান, তাইওয়ান, বাণিজ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশই সংলাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ট্রাম্প বলেন, ২০১৬ সালে তার প্রথম নির্বাচনের সময় থেকেই শির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব রয়েছে, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দুই দেশের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

স্থিতিশীল সম্পর্কের বার্তা

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে চীনা পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের পর বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা বেড়ে যায়। এর প্রভাব নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই নেতা উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।

শি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সংঘাত এড়াতে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, তবে এমন প্রতিযোগিতা নয় যেখানে একজনের জয় মানেই অন্যজনের পরাজয়।

শি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পরস্পরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। তাই দুই দেশের মধ্যে ‘স্বাস্থ্যকর’ প্রতিযোগিতা থাকা উচিত, তবে সেই প্রতিযোগিতারও সীমা থাকা প্রয়োজন।

আলোচনায় ইরান যুদ্ধ

শির সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হয়ে উঠেছে ইরান যুদ্ধ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টায় চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন। তবে ইরানের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এ বিষয়ে সরাসরি যুক্ত হতে অনাগ্রহী।

ট্রাম্প-শি বৈঠকে ইরান ইস্যুতে বড় কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। শি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগের অন্তর্বর্তী চুক্তির কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

শির সফর নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

শিকে হোয়াইট হাউসে জাঁকজমকপূর্ণভাবে স্বাগত জানানোর বিষয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে। রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক উদ্বেগ রয়েছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনও ট্রাম্পের কূটনৈতিক পদ্ধতির সমালোচনা করেন। তবে কয়েকজন আইনপ্রণেতা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

রিপাবলিকান সিনেটর র‌্যান্ড পল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈঠককে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘কূটনীতিই গুরুত্বপূর্ণ—আরও কথা বলুন, যুদ্ধ কমান।’

তাইওয়ান নিয়ে শির সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে। অন্যদিকে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে শি তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান না নিতে এবং এ বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ না করায় তাইওয়ান ইস্যুতে দুই নেতার মধ্যে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

এর আগে মে মাসে শির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজের চূড়ান্ত অনুমোদন পিছিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি চীনের সঙ্গে আলোচনায় অস্ত্র বিক্রিকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন।

তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নীতি নিয়েও এ কারণে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে তাইওয়ান প্রণালির বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে।

প্রতিযোগিতা থাকলেও সংলাপ অব্যাহত

ট্রাম্প-শি বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে আপাতত সংঘাতের বদলে সংলাপের পথে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে ইরান, তাইওয়ান, বাণিজ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মৌলিক মতপার্থক্য এখনও রয়েছে।

ফলে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতার বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তনের ইঙ্গিত এই বৈঠক থেকে পাওয়া যায়নি।

সূত্র: আল-জাজিরা