মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা তীব্র জনবল সংকটে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক,চলতি দায়িত্ব আছে ৪৫ জন শিক্ষক। এছাড়া সহকারী শিক্ষকের পদখালি রয়েছে ৭৭টি । এর বেশিরভাগ রয়েছে চর অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে।
বর্তমানে ৪৫টি বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্ব এবং ২৬টি বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের তীব্র সংকটে পড়েছে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম।
শুধু যে বিদ্যালয় গুলোতে সংকট তা নয়, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও দেখা দিয়েছে তীব্র জনবল সংকট। কার্যালয়টির অনুমোদিত ১০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪ জন। এর মধ্যে সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ৪টি পদের ২টিই শূন্য। এছাড়া অফিসে সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর ও উচ্চমান সহকারী-কাম-হিসাবরক্ষকসহ ৫টি পদের ৪টি শূন্য থাকায় দাপ্তরিক কাজ চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে । এতে একদিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যালয় পরিদর্শন, প্রশাসনিক তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিংয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। ফলে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চরাঞ্চল ও অবহেলিত এই উপজেলার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এতে সাধারণ ও অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। অভিভাবকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে নানা সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষক সংকট, যাতায়াতের দুর্ভোগ, আবাসন সংকট, নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, মোবাইল নেটওয়ার্কের দুরবস্থা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে এসব বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা থাকলেও তা সমাধানে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্গম চরাঞ্চলের এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে যাতায়াতের বড় সমস্যা। যমুনা নদীর ভাঙন ও নৌপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষককে প্রতিদিন সমতল এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌযানে নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। নৌযান সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং কখনো কখনো নৌযান মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
২৯ নং চরভারেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক বলেন, আমার বিদ্যালয়ে ৭ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩ জন শিক্ষক কর্মরত আছি। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত শিক্ষক পদায়ন না দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এছাড়াও ৩০ নং যদুদূর্গাপুর ৫টি,৬১ নং দক্ষিণ চরভারেঙ্গা ৪টি,৩১নং যমুনা চরকাটারী ৪টি,৫নং বাঘুটিয়া ৫টি,৩৩নং চরকাটারী ৪টি,৫৪নং চরকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩টি সহ বেশিরভাগ চর অঞ্চলের বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, চরাঞ্চলে কাজ করার জন্য কোনো ধরনের বিশেষ যাতায়াত সুবিধা কিংবা দুর্গম এলাকার ভাতা না থাকায় তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় নৌপথ ও দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে গিয়ে শারীরিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মোবাইল নেটওয়ার্কের দুরবস্থা। চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় শিক্ষকদের কর্তৃপক্ষের যোগাযোগও অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে শিক্ষক ও তাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
নদীভাঙন ও বন্যার সময় এসব সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। স্বাভাবিক সময়ে যে পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব, বর্ষা বা বন্যার সময় সেই পথ হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। নৌযান নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় যাতায়াত খরচও বাড়ে। অনেক সময় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষকরা প্রশাসনিক জটিলতার মুখেও পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দুর্গম এলাকায় দীর্ঘদিন কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
চরাঞ্চলের মানুষের অভিযোগ ও শিক্ষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্গম এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা কঠিন। তাই স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মূলধারার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করার উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এব্যাপারে ৮০ নং চরকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রহিম বলেন-চরাঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার জন্য সদ্য নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষকদের চর অঞ্চলে পদায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া চরভাতা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিও জানান তিনি।
সরেজমিনে কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, এক-দুজন শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান চালানো হচ্ছে। প্রধান ও সহকারী শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজের অতিরিক্ত চাপে স্বাভাবিক শিখন কার্যক্রম থমকে গেছে। দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি এবং নতুন সহকারী শিক্ষক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদায়নের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও স্থানীয় অভিভাবকেরা।
দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর ফিরোজ বলেন, অবসর, বদলি, মৃত্যু ও মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষকের পদগুলো শূন্য হয়েছে। ইতোমধ্যে শূন্য পদের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা অফিসেও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদসহ ৬টি পদ খালি রয়েছে। শিক্ষক সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চর অঞ্চলে নতুন শিক্ষক পদায়নের দাবি জানানো হয়েছে। সমস্যা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।