সংবিধান সংশোধনে জুলাই জাতীয় সনদে নিজেদের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত বিএনপি। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে বিরোধী দলকে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
মঙ্গলবার সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এসব কথা জানান।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে এদিনের বৈঠকে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের প্রধান নির্বাহী, সম্পাদক এবং টকশো আলোচকেরা অংশ নেন।
বৈঠকে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা সংবিধানের টেকসই সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, স্বাধীনতার পর সংবিধানে বহুবার সংশোধনী আনা হয়েছে। এবার এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে তা দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই হয় এবং ভবিষ্যতে বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন না পড়ে।
একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরিতে বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় যুক্ত করার আহ্বান জানান তারা।
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত। আমরা আপনাদের (গণমাধ্যম) মাধ্যমে বিরোধী দলকে আহ্বান জানাই, তারা যেন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করেন এবং আলোচনায় আসেন।’
জুলাই সনদে বিএনপির দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাই সনদ যেভাবে সই হয়েছে, সেটিই অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। এখন বিরোধী দল জুলাই সনদের কিছু অংশ থেকে সরে আসতে চাইলে বা কোনো বিষয়ে তাদের ভিন্নমত থাকলে, আলোচনার ভিত্তিতে সেটিতে সমঝোতা হতে পারে। এ জন্য তো তাদের আলোচনায় আসতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নিয়ে ভিন্নমত
বৈঠকে একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী থাকার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত রাখার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, কেউ কেউ মনে করেন, এভাবে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক। তবে জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করেছিলেন, কোনো ব্যক্তি যেন সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকেন। বিএনপি এখনও সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
দ্বিকক্ষ সংসদ নিয়েও আলোচনা
বৈঠকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও মতামত দেওয়া হয়। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কেউ কেউ এ ব্যবস্থার আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়ে মত দিয়েছেন। তবে জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে ঐকমত্য থাকায় সেভাবেই এগোতে চায় কমিটি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ।
যে বিষয়গুলোতে প্রস্তাব এসেছে
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীকরণ, সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাব উঠে আসে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকর সংশোধনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ও টেকসই করতে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক ও বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আব্দুল হাই সিদ্দিক বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও স্থায়ী ভিত্তি দেওয়ার প্রস্তাব তারা দিয়েছেন।
যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ বলেন, সরকারকে ছাড় দিয়ে হলেও বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
বৈঠকে কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ ছাড়াও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, নুরুল হক নুর, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মাহমুদুল হক রুবেল অংশ নেন।