পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার অফিস সহকারী উজ্জ্বল হোসেনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুর্নীতির রাজত্ব তিনি একা চালাননি বরং ওই শাখারই সদ্য বদলি হওয়া প্রধান অফিস সহকারী খালিদ হোসেনের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে তার সঙ্গে নিখুঁত সমন্বয় করে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হতো। তবে সিন্ডিকেটের মূল হোতা খালিদ হোসেন সম্প্রতি বদলি হলেও উজ্জ্বল হোসেন একই ডেস্কে বহাল তবিয়তে থাকায় তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে ভুক্তভোগীদের মাঝে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত প্রায় দেড় বছর ধরে প্রধান অফিস সহকারী খালিদ হোসেন ও অফিস সহকারী উজ্জ্বল হোসেনের এই যুগলবন্দি সিন্ডিকেট এলএ শাখাকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করে। সরকারি প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড়ানোর নামে তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখতেন। উজ্জ্বল হোসেন মাঠ পর্যায় থেকে ফাইল ও ভুক্তভোগীদের ম্যানেজ করতেন এবং প্রধান অফিস সহকারী খালিদ হোসেন টেবিল ও ফাইলের আইনি জটিলতা তৈরির ভয় দেখিয়ে প্রকাশ্যেই বড় অঙ্কের ঘুষ দাবি করতেন। তাদের দাবিকৃত ঘুষের টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হতো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তোলা এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গত দেড় বছরে তারা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
প্রধান অফিস সহকারী খালিদ হোসেন পটুয়াখালী থেকে সংযুক্তিতে উপজেলা ভূমি অফিস বাউফল বদলি হওয়ার পর এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ পেতে শুরু করলেও উজ্জ্বল হোসেনের কোনো বদলি বা শাস্তি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলএ শাখায় ক্ষতিপূরণের টাকা নিতে আসা এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “খালিদ সাহেব বদলি হয়ে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তার বিশ্বস্ত সহযোগী উজ্জ্বল তো এখনও এই চেয়ারেই বসা। আমার ফাইলের সামান্য ভুলের অজুহাত দেখিয়ে উজ্জ্বল আমার কাছে তিন লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিল। টাকা দিতে না পারায় ফাইল আটকে আছে। এই দুর্নীতিবাজ চক্রের মূল এবং সহযোগীদের না সরালে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কোনোদিন শেষ হবে না।
একই শাখায় দীর্ঘদিন ধরে ঘুরতে থাকা অপর এক ভুক্তভোগী মোসাম্মৎ মরিয়ম বেগম বলেন, “বিগত দেড় বছর ধরে খালিদ আর উজ্জ্বল মিলে সিন্ডিকেট চালিয়ে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে। খালিদ চলে গেলেও উজ্জ্বল এখনও বহাল তবিয়তে থেকে আগের মতোই ফাইল আটকে রাখছে এবং মানুষকে হয়রানি করছে। আমরা এই ঘুষখোর উজ্জ্বলের অনতিবিলম্বে অপসারণ এবং তার অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
বিগত সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে একজন সাধারণ অফিস সহকারী হয়েও উজ্জ্বল হোসেন বরিশাল, পটুয়াখালী ও তার নিজ এলাকায় নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। তার এই রাজকীয় জীবনযাপন ও বৈধ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল সম্পদের বিষয়টি এখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ওপেন সিক্রেট।
উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ নেই। সদ্য বদলি হওয়া প্রধান অফিস সহকারী এবং বর্তমান অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে যে সিন্ডিকেট ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনসাধারণের হয়রানি বন্ধে জেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছে।”
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পটুয়াখালী জেলা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, “ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অফিস সহকারী উজ্জ্বল হোসেন ও সাবেক প্রধান অফিস সহকারী খালিদ হোসেনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও কোটি টাকা আত্মসাতের একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আমাদের এনফোর্সমেন্ট টিম প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের কাজ করছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে খুব দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া ও নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অফিস সহকারী উজ্জ্বল হোসেন ও সদ্য বদলি হওয়া প্রধান অফিস সহকারী খালিদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।