সংবাদ প্রকাশের জেরে সন্ত্রাসী হামলায় আহত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল বারী দুলালকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে গেছেন রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটির আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সুধীজন।
রোববার (৪ অক্টোবর) বিকেলে রংপুরের গঙ্গাচড়া ৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংবাদিক আব্দুল বারী দুলালের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে যান তারা। সাংবাদিক দুলাল দৈনিক প্রতিদিনের বার্তা ও দৈনিক লাখোকণ্ঠের গঙ্গাচড়া প্রতিনিধি এবং গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি।
এ সময় সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন, নিজের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই তিনি আহত সাংবাদিককে দেখতে হাসপাতালে এসেছেন। সাংবাদিকরা দেশের দর্পণ। তারা সমাজের নানা অনিয়ম, অসঙ্গতি ও বাস্তবতা জাতির সামনে তুলে ধরেন। একজন সাংবাদিকের ওপর এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় তিনি তীব্র নিন্দা জানান।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আহত সাংবাদিকের চিকিৎসার খোঁজখবর নেওয়ার কথা জানান সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী।
পরে তিনি আহত সাংবাদিকের চিকিৎসার বিষয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন।
এ সময় হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মাহাবুব হাসানসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গঙ্গাচড়া উপজেলা আমির মাওলানা নায়েবুজ্জামান, গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়ন আমির ও সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মনিছুর রহমান, উপজেলা জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া প্রধান আশরাফুল আলমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
চিকিৎসকরা সংসদ সদস্যকে জানান, সাংবাদিক আব্দুল বারী দুলালের মাথা ও বাম পায়ে আঘাত রয়েছে। বর্তমানে তিনি স্বাভাবিক আছেন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হামলার ঘটনা
উল্লেখ্য, অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিক আব্দুল বারী দুলালের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের উমর বাজার এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।
আহত সাংবাদিক আব্দুল বারী দুলাল বাংলাদেশ বুলেটিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মো. ওয়াসিমুল বারী সিয়ামের বাবা। তিনি দৈনিক লাখোকণ্ঠ ও দৈনিক প্রতিদিনের বার্তার গঙ্গাচড়া প্রতিনিধি এবং গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি।
অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় আঘাত করেন। এতে তার মাথা ফেটে রক্তাক্ত হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৩০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন গজঘণ্টা ইউনিয়নের উমর এলাকায় কৃষিজমি থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাটি ও বালু উত্তোলনের অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করেন গঙ্গাচড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হামিদুর ইসলাম। অভিযানে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়।
পরে ওই অভিযানের সংবাদ দৈনিক প্রতিদিনের বার্তা, দৈনিক প্রতিচ্ছবি, দৈনিক লিখনি সংবাদসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই সাংবাদিক আব্দুল বারী দুলালকে মৌখিকভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সন্ধ্যায় উমর বাজার এলাকায় তাকে একা পেয়ে পথরোধ করা হয় বলে অভিযোগ। হামলার সময় কয়েকজন তাকে গলা চেপে ধরেন এবং পেছন থেকে হাত আটকে রাখেন। এ সময় পেছন থেকে আরেক ব্যক্তি কাঠ কাটার ধারালো কুড়ালের উল্টো পিঠ দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আঘাতে মাথা ফেটে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে যান সাংবাদিক দুলাল। এরপরও তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া বড় ছেলের সেমিস্টার ফি ও থাকা-খাওয়ার খরচ বিকাশে পাঠানোর জন্য সঙ্গে থাকা নগদ ৩৫ হাজার টাকা এবং শার্টের বাম পকেটে থাকা Oppo A57 মডেলের মোবাইল ফোনটি নিয়ে হামলাকারীরা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গজঘণ্টা ইউনিয়নের উমর গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত গোলজার হোসেনের ছেলে কামরুজ্জামান ও তার ছোট ভাই আমানুল্লাহ আমানসহ ৭-৮ জন এ হামলায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে গঙ্গাচাড়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা হাসপাতালে ছুটে যান। পরে গঙ্গাচাড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সবুর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ গঙ্গাচড়া উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দ এবং সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী আহত সাংবাদিককে দেখতে হাসপাতালে যান।
এ ছাড়া গঙ্গাচড়া সরকারি মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আখের মিঞা, হাজী দেলওয়ার হোসেন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. সাইয়েদুল ইসলাম, আলমবিদিতর উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সুব্রত রায়, উপজেলা কৃষি অফিসের অফিস সহকারী কাম-মুদ্রাক্ষরিক মাহফুজ, উপজেলা মডেল মসজিদের ইমাম আসাদুজ্জামান নুর, অবসরপ্রাপ্ত সুলতান আহমেদ এবং দৈনিক প্রতিদিনের বার্তার নির্বাহী সম্পাদক আমানত হোসেনসহ অনেকে হাসপাতালে গিয়ে আহত সাংবাদিকের খোঁজখবর নেন।
এ ছাড়া মুঠোফোনে গঙ্গাচড়ায় কর্মরত সাবেক ইউএনও নাহিদ তামান্না, তাসলিমা বেগম ও কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হোসেনসহ আরও অনেকে আহত সাংবাদিকের খোঁজখবর নিয়ে সমবেদনা জানান।
এ ঘটনায় রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরপিইউজে), গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রেসক্লাব, গঙ্গাচড়া প্রেসক্লাব, রংপুর প্রেসক্লাব, রংপুর সদর উপজেলা প্রেসক্লাব, মিঠাপুকুর প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।