নারীদের যাতায়াতের জন্য চালু করা পিংক বাস সার্ভিসে এক মাসের ব্যবধানে যাত্রীসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে যাত্রী বাড়লেও ভাড়া থেকে আয় তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।
গত ১৮ আগস্ট চালু হওয়া এই বিশেষায়িত বাস সার্ভিসে শুরুতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৫০ জন যাত্রী চলাচল করতেন। এক মাসের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রতিদিন ভাড়া বাবদ আয় হচ্ছে গড়ে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। বিপরীতে একই সময়ে সরকারের ভর্তুকি লাগছে ৫০–৬০ হাজার টাকা।
বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে রাজধানী, বগুড়া ও চট্টগ্রামের ১৩টি রুটে ১৪টি পিংক বাস নামানো হয়েছে। ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও নয়টি দ্বিতল বাস, বগুড়ার দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং চট্টগ্রামের একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলছে।
সার্ভিস চালুর পর ১৯ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ দিনে বাসগুলো মোট ২৭২টি ট্রিপ দিয়েছে। এ সময়ে প্রায় ২১ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন যাত্রী ছিল ১ হাজার ৪০ জন। ২০ দিনে ভাড়া বাবদ আয় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। বিপরীতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।
বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানান, সকাল ৭টা থেকে ৮টা ৪০ মিনিটের মধ্যে বাসগুলো বিভিন্ন রুটে ছেড়ে যায়। ঢাকায় বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে এবং বগুড়া ও চট্টগ্রামে দুপুর ১টা ও বিকেল ৩টার দিকে বাস চলাচল করে। ফলে অফিস সময়ের বাইরে দিনের বড় একটি সময় বাসগুলো ডিপোতে অলস পড়ে থাকে।
স্টপেজ ও সময়সূচি নিয়ে অভিযোগ
পিংক বাস চালুর সময় বিআরটিসি জানিয়েছিল, ঢাকা মহানগরীর ১০৬টি, চট্টগ্রামের ১২টি এবং বগুড়ার ১৬টি স্পট থেকে যাত্রী ওঠানামা করবেন। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষমাণ যাত্রী না দেখলে নির্ধারিত স্টপেজেও বাস থামছে না।
বিআরটিসির এক কর্মকর্তা জানান, নারী চালকদের অনেকেই এখনো প্রতিটি স্টপেজে দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করার অভ্যাস তৈরি করতে পারেননি। পাশাপাশি অন্য বাসকে পাশ কাটিয়ে নির্ধারিত স্থানে বাস থামানোর ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম। তবে সময়ের সঙ্গে এ সমস্যা কমে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
যাত্রীদের আরও অভিযোগ, বাস ছাড়ার সময় এবং নির্দিষ্ট স্টপেজে পৌঁছানোর নির্ভরযোগ্য সময়সূচি না থাকায় অনেকে অপেক্ষা করেও বাস পাচ্ছেন না। দিনে মাত্র দুই দফা চলাচল এবং নির্দিষ্ট স্টপেজের কারণে অনেক নারী নিয়মিত এই সেবা নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
যাত্রী বাড়লেও প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী পিংক বাস সার্ভিসকে অদূরদর্শী প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যথেষ্ট পরামর্শ বা জরিপ ছাড়াই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানও আলাদা নারী বাস সার্ভিসকে কার্যকর সমাধান মনে করেন না। তার মতে, বাসের রঙ পরিবর্তন বা আলাদা নাম দেওয়ার পরিবর্তে সব গণপরিবহন নারী ও শিশুবান্ধব করা প্রয়োজন।
তবে বিআরটিসির ডিজিএম (অপারেশন) শুকদেব ঢালী বলছেন, পিংক বাসে নারী যাত্রীদের আগ্রহ বাড়ছে। মাত্র এক মাসে যাত্রী প্রায় দ্বিগুণ হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। তার মতে, এই মুহূর্তে লাভ-লোকসানের হিসাবের চেয়ে সেবার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাড়ছে নারী চালকের সংখ্যা
পিংক বাস সার্ভিসে নারী চালকের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রশিক্ষণ শেষে দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০ জন নারী চালক গত বৃহস্পতিবার যোগ দিয়েছেন। ফলে বর্তমানে নারী চালকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ জনে।
বিআরটিসি জানিয়েছে, তৃতীয় ধাপের নারী চালকদের প্রশিক্ষণ চলতি মাসে শুরু হবে। ভবিষ্যতে ইলেকট্রিক বাস চালানোর জন্য নারী চালকদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
আসছে আরও ১০০ আধুনিক বাস
পিংক বাসের বহরে আরও ১০০টি অত্যাধুনিক বাস যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন বাসগুলো তুলনামূলক ছোট আকারের হবে। এতে ওয়াই-ফাই, সিসি ক্যামেরা, এসি এবং অন্যান্য আধুনিক সুবিধা থাকবে।
যাত্রীসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও নির্দিষ্ট সময়সূচি, স্টপেজ ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত ট্রিপ নিশ্চিত করা গেলে এই বিশেষায়িত নারী বাস সার্ভিস আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।