শেরপুরের ঝিনাইগাতী সীমান্তের গারো পাহাড়ে পাথর-বালু উত্তোলনকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ের মাটি কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু সংগ্রহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের অভিযান হলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি উত্তোলন ও পরিবহন।
উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গান্ধিগাঁও, দরবেশতলা, হালচাটি, মালিটিলা, বাকাকুড়া, গজনী ও ছোট গজনীসহ বিভিন্ন এলাকায় পাথর-বালু সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, শ্রমিকরা বেলচা-কোদালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে নদী-ঝরনা ও পাহাড়ের বিভিন্ন অংশ থেকে পাথর-বালু সংগ্রহ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, উত্তোলন করা পাথর-বালু প্রথমে বিভিন্ন স্থানে জমা করে রাখা হয়। পরে রাতের বেলায় ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকের মাধ্যমে তা অন্যত্র নেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, রাতের এই পরিবহন ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
এদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে বাকাকুড়া এলাকায় বালুভর্তি একটি মাহিন্দ্র দুর্ঘটনার শিকার হলে মিজান মিয়া (১৭) নামে এক তরুণ নিহত হন। তিনি সন্ধ্যাকুড়া গ্রামের মরহুম টুকন মিয়ার ছেলে। ঘটনাটি অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পাথর-বালু উত্তোলনের কারণে পাহাড়ের ঢাল ও মাটির গঠন পরিবর্তনের পাশাপাশি নদী-ঝরনার তলদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এতে পানিপ্রবাহ, বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
গারো পাহাড় শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের আধার নয়, এটি শেরপুরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন সম্পদও। ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গজনী এলাকায় গড়ে ওঠে ‘গজনী অবকাশ’ বিনোদনকেন্দ্র। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক এ এলাকায় ভ্রমণে আসেন। কিন্তু পাহাড় কাটা ও নির্বিচারে পাথর-বালু উত্তোলনের অভিযোগ অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অবৈধ উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযানে বালুবাহী যানবাহন আটক, জরিমানা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও বিভিন্ন স্থানে উত্তোলন শুরু হয়।
গত ৩ জুন রাতে বালুভর্তি চারটি মাহিন্দ্র আটককে কেন্দ্র করে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে উত্তোলনকারীদের বিরোধের ঘটনাও ঘটে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বন কর্মকর্তা ছালেহিন নেওয়াজ ও বনপ্রহরী জিয়াউর রহমান আহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
রাংটিয়া ফরেস্ট রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক এসবি তানভির আহমেদ ইমন বলেন, “কেউ বালুভর্তি গাড়ি পাচারের সময় সন্ধান দিলে তা আটক করা হবে।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিন্দা রানী ভৌমিক বলেন, “তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, গারো পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি ও সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগ। একই সঙ্গে পাথর-বালু উত্তোলনের বৈধতা, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশগত ক্ষতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তাদের দাবি, গারো পাহাড়ের পাহাড়, নদী ও ঝরনা শুধু স্থানীয় মানুষের সম্পদ নয়—এগুলো শেরপুরের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বার্তাপ্রেরক:
আল আমিন
ঝিনাইগাতী, শেরপুর