বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) সাবেক পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে সীমাহীন অনিয়ম, টেন্ডারবাজি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং পদ-পদবি ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তোপের মুখে এবং ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের চরম ক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখন আইনি তদন্তের দাবি চারদিক থেকে জোরালো হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে তৎকালীন বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবশালী সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর সাথে অত্যন্ত নিবিড় সখ্যতা ও বিশেষ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন ডা. সাইফুল ইসলাম। এই রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অবৈধ আশ্রয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি হাসপাতালে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার সুবাদে ডা. সাইফুল হাসপাতালের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলেন এবং বিভিন্ন অনিয়ম, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, ওষুধ চুরির সিন্ডিকেট ও প্রকাশ্য টেন্ডারবাজির মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা অনায়াসে হাতিয়ে নেন।

তিনি যখন পরিচালক পদে দায়িত্বরত ছিলেন, তখন হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অচল করে রোগীদের নিয়ে এক চরম বাণিজ্যের ফাঁদ পেতেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ডা. সাইফুল একটি নিজস্ব বিশ্বস্ত দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। শেবাচিম হাসপাতালে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় গর্ভবতী নারীদের এই দালাল চক্রের মাধ্যমে সুকৌশলে ও নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর নিজস্ব প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা ও সিজারিয়ান অপারেশন প্রদান করানো হতো। এভাবে সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কমচারীদের নিয়মিত হয়রানি করা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করে শেবাচিমের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন তিনি।

দুর্নীতির এই বিশাল কালো টাকা দিয়ে ডা. সাইফুল ইসলাম অল্প সময়ের মধ্যেই রূপকথার মতো এক বিশাল সম্পদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। প্রাপ্ত বিশ্বস্ত তথ্যানুযায়ী, বরিশাল নগরীর অত্যন্ত প্রাইম লোকেশন হিসেবে পরিচিত সিএন্ডবি রোড ১ নং পুল সংলগ্ন রাস্তার পাশেই রয়েছে তাঁর একটি ২০ শতাংশের বিশাল বাণিজ্যিক প্লট। এই বহুমূল্য প্লটের ১০ শতাংশ জমির ওপর তিনি নির্মাণ করেছেন একটি আলিশান ৫ তলা ভবন, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এই বিলাসবহুল ভবনের প্রথম এবং দ্বিতীয় তলা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান ‘নিরূপণ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আলিশান ভবনের তৃতীয় তলাতেই তিনি অত্যন্ত বিলাসবহুলভাবে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

এখানেই শেষ নয়, ডা. সাইফুলের এই সম্পদের বিস্তৃতি ঘটেছে শহরের অন্যান্য এলাকাতেও। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ডা. সাইফুলের মালিকানাধীন আরও দুটি বিশাল ও মূল্যবান প্লটের সন্ধান মিলেছে, যার একটি ৪০ শতাংশ এবং অপরটি ৩০ শতাংশ। বর্তমান আবাসন বাজারের হিসেবে এই দুটি প্লটের বাজার মূল্যও শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে স্থানীয় ভূমি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এছাড়া তাঁর ও তাঁর পরিবারের ব্যবহারের জন্য রয়েছে দুটি দামি গাড়ি, যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। একজন সরকারি চাকরিজীবীর বৈধ আয়ের সাথে এই সম্পদের আকাশ-পাতাল ব্যবধান দেখে খোদ বরিশালবাসী বিস্মিত!
এদিকে তাঁর এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য, পাঁচ তলা ভবন, বিলাসবহুল গাড়ি ও পরিবার নিয়ে নিরূপণ হাসপাতালের তৃতীয় তলায় বসবাসের বিষয়ে জানতে এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলামের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি অধিকাংশ সময়ই ফোন রিসিভ করেননি। তবে এক পর্যায়ে কল রিসিভ করে তাঁর এই বিপুল সম্পদের বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করতেই তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “গাড়ি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কেনা হয়েছে”। এই একটি মাত্র বাক্য বলেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে লাইনটি কেটে দেন। এরপর তাঁর বক্তব্য বিস্তারিত জানতে আবারও একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।
ডা. সাইফুলের এই প্রকাশ্য ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’ বা শ্বেতহস্তী দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবশেষে রাষ্ট্রীয় করদাতাদের টাকা ও জনস্বার্থ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর এসব অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরে ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদিসহ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এই বিপুল সম্পদের অন্তরালের উৎস খুঁজতে এবং অভিযোগের দালিলিক সত্যতা যাচাইয়ে খুব শিগগিরই মাঠ পর্যায়ে একটি বিশেষ তদন্ত দল নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হতে যাচ্ছে।
তবে সমস্ত ক্ষমতার উৎস হারিয়ে ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ না পেয়ে এখন সাংবাদিকদের এড়িয়ে চললেও, এর আগে গণমাধ্যমের কাছে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ বরাবরই ঢালাওভাবে অস্বীকার করেছিলেন ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম। তখন তাঁর দাবি ছিল, হাসপাতালে তিনি সংস্কার করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর বিরোধী একটি বিশেষ চিকিৎসক ও কর্মকর্তা চক্র ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গণমাধ্যমে এসব মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। নিজস্ব প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী দেখার ব্যক্তিগত আয় এবং দীর্ঘদিনের সরকারি বেতনের জমানো টাকা দিয়েই সিএন্ডবি রোডের ভবনটি আইনসম্মতভাবে নির্মাণ করেছেন বলে তিনি দাবি তুলে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেছিলেন।
এদিকে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী এবং শেবাচিমের সৎ ও পেশাদার চিকিৎসকদের দাবি, ডা. সাইফুলের আমলের হাসপাতালের সমস্ত কেনাকাটা, চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির বিল, টেন্ডার বাণিজ্য এবং ফ্যাসিবাদের ছত্রছায়ায় অর্জিত এই দৃশ্যমান বিশাল সম্পদের সঠিক উৎস খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যেন কোনো ধরনের আপস না করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্নীতিবাজ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করে।