একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই অপেক্ষায় থাকা মানুষের মনে জেগে উঠত আনন্দ। দূর শহর কিংবা প্রবাস থেকে আসা একটি চিঠির অপেক্ষায় কাটত দিনের পর দিন। হলুদ খামের ভাঁজে লেখা ভালোবাসা, অভিমান আর বিচ্ছেদের কথায় দূরত্ব ঘুচে যেত। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমেছে ব্যাপকভাবে। ফলে ঐতিহ্যবাহী ডাকসেবার জায়গা দখল করেছে সরকারি নথি, আদালতের কাগজপত্র, পাসপোর্ট, ভূমির রেকর্ড ও ই-কমার্সের পার্সেল।
নতুন নতুন সেবা চালু করে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে ডাক বিভাগ। গত তিন অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় বেড়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা। তবে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা হওয়ায় আয়-ব্যয়ের বিশাল ব্যবধান কাটছে না। এমন বাস্তবতায় আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডাক দিবস।
তিন বছরে আয় বেড়েছে ১১৭ কোটি টাকা
দেশে প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬০০টি সরাসরি পরিচালনা করে ডাক বিভাগ। বাকিগুলো পরিচালিত হয় এজেন্টের মাধ্যমে।
ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি ও অন্যান্য চিঠিপত্র মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ ডাক পরিবহন করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ১০ লাখে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ হয়েছে।
ডাক পরিবহনের সংখ্যা বাড়লেও আর্থিক চাপ কমেনি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডাক বিভাগের আয় ছিল প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৫৩ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৩৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ তিন বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। পেনশন ও আনুতোষিকে ব্যয় হয় ২৬০ কোটির বেশি। সব মিলিয়ে বাজেটের প্রায় ৯৩ শতাংশ বেতন, পেনশন ও প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হয়। ফলে রাজস্ব আয় বাড়লেও আর্থিক ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিঠির বদলে পার্সেল ও বহুমুখী সেবা
ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ায় আয়ের নতুন উৎস তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছে ডাক বিভাগ। এ লক্ষ্যে আর্থিক লেনদেন, সরকারি নথি বিতরণ ও পণ্য পরিবহনের মতো সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
২০১৯ সালে চালু হওয়া ‘নগদ’ থেকে ডাক বিভাগ আগে বছরে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেত। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১৮ কোটি টাকা।
এ ছাড়া পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ভূমির খতিয়ান বা পরচা গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সেবা চালু রয়েছে। এ পর্যন্ত ৭ লাখের বেশি ভূমি রেকর্ড গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছে নতুন সেবার তালিকায়। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশে ও বিদেশে থাকা ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন এ সুবিধা নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পণ্য পরিবহনে গত মার্চে চালু করা হয়েছে স্পিড পোস্ট। চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত এ সেবায় প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পার্সেল সেবাতেও পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এ সেবায় ২৪৩ টন পণ্য পাঠানো হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৩১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় বাজারেও পণ্য পরিবহনের পরিধি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বেসরকারি কুরিয়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা
ডাক বিভাগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়া, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পার্সেলের অবস্থান শনাক্ত করা এবং গ্রাহকের বাড়ি থেকে পণ্য সংগ্রহের মতো সুবিধা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ডাক বিভাগের অনেক কার্যক্রম এখনও পুরোনো অবকাঠামো ও জনবল সংকটের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত ডেলিভারি এবং গ্রাহকসেবার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
বিশেষ করে পচনশীল পণ্য পরিবহনে আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবহনের অভাব রয়েছে। ফলে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হলে ফলসহ বিভিন্ন পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতিও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিসে নতুন সম্ভাবনা
ব্যয় কমিয়ে সেবার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে গত ২৯ জুলাই চালু করা হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস ও পোস্ট পিকআপ পয়েন্ট। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনাসহ ১২টি অঞ্চলে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
চুক্তির আওতায় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে চিঠি ও পার্সেল সংগ্রহ এবং বিতরণ করতে পারবে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী এসব কেন্দ্র সরকারি ডাকঘরের তুলনায় বেশি সময় খোলা রাখারও সুযোগ থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন গ্রাহক যুক্ত হবে, পার্সেল পরিবহনের পরিমাণ বাড়বে এবং ডাক বিভাগের নিজস্ব পরিচালন ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
বিশ্ব ডাক দিবস ও ডাক সপ্তাহের আয়োজন
এ বছরের বিশ্ব ডাক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’। বাংলাদেশে ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর পালিত হচ্ছে ডাক সপ্তাহ। শুক্র ও শনিবার সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম ছাড়া অন্যান্য ডাকসেবা চালু থাকবে।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি উৎসব, ডাকটিকিট প্রদর্শনী ও ডাকমেলার আয়োজন করা হয়েছে।
বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘ডাক বিভাগ এখন আর শুধু প্রথাগত চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়। বরং এটি একটি আধুনিক ও বহুমুখী সেবা নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। জনগণের আস্থা অর্জনই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারে ব্যক্তিগত চিঠির যুগ অনেকটাই পেছনে পড়ে গেলেও ডাক বিভাগের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং সরকারি নথি বিতরণ, পার্সেল পরিবহন ও ই-কমার্সের বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই ডাক বিভাগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।