পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার আপত্তি শাখায় অফিস সহকারী শামীম খান-এর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও ভুক্তভোগীদের চরম হয়রানির বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও, স্থানীয় দালাল চক্রের সাথে যেন এক অদৃশ্য যোগসাজশে নিজের শক্তিশালী সিন্ডিকেট অক্ষুণ্ন রেখে তিনি তার বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানি অব্যাহত রেখেছেন বলে ভুক্তভোগী ও অনুসন্ধানে জানা গেছে।
বিশেষ করে পটুয়াখালী জেলার অন্যতম মেগা প্রকল্প পায়রা পোর্ট (পায়রা সমুদ্র বন্দর) সহ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে শামীমের বিরুদ্ধে উঠেছে মারাত্মক জালিয়াতির অভিযোগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পায়রা পোর্ট ও জেলার অন্যান্য এলাকায় অধিগ্রহণকৃত যেসব জমিতে বৈধ অংশীদারদের ‘আপত্তি’ বা বিরোধ রয়েছে, সেই আপত্তিগুলো নিয়ম মাফিক নিষ্পত্তি না করেই পর্দার আড়ালে অনৈতিক চুক্তি করা হচ্ছে। মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে প্রকৃত হকদারদের বঞ্চিত করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নামে তড়িঘড়ি করে ক্ষতিপূরণের চেক পাইয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শামীম খানের বিরুদ্ধে।
নিয়ম অনুযায়ী আপত্তি জমা পড়ার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে তা ‘মিসকেস’ (বিবিধ মামলা) হিসেবে রুজু করে শুনানির ব্যবস্থা করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, সাধারণ ও অসহায় মানুষের ক্ষেত্রে শামীম খান তা ফাইলবন্দি করে রাখেন। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে একই টেবিলে খুঁটির জোরে বসে থেকে তিনি আপত্তি নিষ্পত্তির নামে অলিখিত ‘উপরি’ বাণিজ্যের রাজত্ব কায়েম করেছেন। মাসের পর মাস পার হলেও কোনো মিসকেস রুজু করা হয় না। ফলে ঝুলে থাকে আপত্তি নিষ্পত্তি, আর ক্ষতিপূরণের চেক না পেয়ে বছরের পর বছর ঘুরতে হয় প্রকৃত ভূমি মালিকদের। অন্যদিকে যারা শামীমের চাহিদা অনুযায়ী বড় অঙ্কের ঘুষের টাকা দিতে পারছেন, তাদের আপত্তির ফাইল রহস্যজনকভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যাচ্ছে অথবা আপত্তি অমীমাংসিত রেখেই চেক ছাড় করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আপত্তি নিষ্পত্তি করতে গেলেই অফিস সহকারী শামীম খান মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। চাহিদামতো টাকা না দিলে ফাইলের গায়ে ধুলো জমলেও তা আলোর মুখ দেখে না। বিগত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা এবং দালালদের ছত্রছায়ায় যে সিন্ডিকেট তিনি গড়ে তুলেছিলেন, সরকার পরিবর্তনের পরও সেই একই চিহ্নিত দালালদের ব্যবহার করে পর্দার আড়াল থেকে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকদের হয়রানি করতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ফাইলের ত্রুটি খোঁজা হয় এবং এই দালাল চক্রের মাধ্যমেই ঘুষের টাকার অঙ্ক নির্ধারণ ও দরকষাকষি করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আপত্তি শাখায় কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট করে ফাইল আটকে রাখা বা আর্থিক লেনদেনের লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে। ভূমি অধিগ্রহণ শাখাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। যদি তদন্তে অফিস সহকারী শামীম খানের বিরুদ্ধে মিসকেস রুজু না করা, গ্রাহক হয়রানি বা দালাল সিন্ডিকেটের সাথে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পটুয়াখালীর এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার জমির অধিগ্রহণের আপত্তির ফাইলটি দেড় বছর ধরে এই শাখায় পড়ে আছে। সাবেক সরকারের আমল থেকেই শামীম সাহেবকে টাকা না দিলে ফাইল নড়ত না, আর এখনো সেই একই দালালদের মাধ্যমেই টাকা দাবি করা হচ্ছে। সরকারি নিয়মকানুন এখানে অচল, ওনার টেবিলের নিয়মই আসল নিয়ম। আমরা জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় একজন অফিস সহকারীর এমন বেপরোয়া আচরণ পুরো দপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তিনি একই গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বহাল তবিয়তে আছেন এবং পুরনো সিন্ডিকেট সচল রেখেছেন, তা নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকের কাছে শামীম খানের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, ফাইল আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং দালালদের নিয়ে ঘুষ বাণিজ্যের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে এই শাখায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্রুত অপসারণ করে প্রকৃত ভূমি মালিকদের ভোগান্তি লাঘবের জোর দাবি উঠেছে।

অভিযোগের পাহাড় ও দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত অফিস সহকারী শামীম খানের মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। উল্টো গণমাধ্যমকর্মীদের ফোন এড়িয়ে গিয়ে এবং আড়াল হতে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সাবেক অফিস সহকারী মিলনের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া ও তড়িঘড়ি করে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মচারীর এমন রহস্যজনক আচরণ, আত্মগোপন এবং সাবেক কর্মচারীকে দিয়ে মধ্যস্থতার চেষ্টা তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের সত্যতাকে আরও জোরালো করছে।
তার এই দুর্নীতির ব্যাপারে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে।