‎
‎‎পটুয়াখালীর গলাচিপায় শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও শতভাগ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গুয়াবাড়িয়া এবি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘শিক্ষিত মা এক সুরক্ষিত ফুল, প্রতিটি ঘর হবে একটি স্কুল’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে সোমবার (১২ অক্টোবর, ২০২৬) সারে ১১ টার দিকে বিদ্যালয়ের হলরুমে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
‎সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোশাররফ হোসেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গলাচিপা মহিলা কলেজের প্রভাষক মো. জাকির হোসেন। আরও উপস্থিত ছিলেন মনির তালুকদার, নাজমুল হাসান, মো. রেজাউল ইয়াসিন, মো. রুহুল আমিন, আবদুল করিম মোল্লা ও জালাল আহমেদ, জাহিদুল ছালামসহ বিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী।
বিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের একটি ভবন নয়; এটি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও জীবন গড়ার ভিত্তি। এ বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন করে, নৈতিকতা শেখে এবং ভবিষ্যতের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তাই শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মাদকাসক্তি ও অতিরিক্ত মোবাইল ফোনের ব্যবহার প্রতিরোধ এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
‎আলোচনা সভায় শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের বয়স হয়তো কম, কিন্তু আমাদেরও কথা আছে, আমাদেরও অধিকার আছে এবং আমাদেরও একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন রয়েছে। আমরা কারও সঙ্গে বিরোধ চাই না; আমরা চাই সমস্যার সমাধান, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান এবং একটি সুন্দর ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ। আজ আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, ছোট বোনদের প্রতি বিশেষ যত্ন, মাদকাসক্তি ও অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কুফল এবং সম্প্রতি বিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই।
‎আমরা একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা চাই। আমরা চাই, আমাদের বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশ আরও উন্নত হোক। শিক্ষার্থীরা যেন আনন্দের সঙ্গে বিদ্যালয়ে আসতে পারে, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারে এবং নিজেদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশের যথাযথ সুযোগ পায়। শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা অর্জন করতে হবে।
‎ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের বিদ্যালয়ের ছোট ছোট বোনদের নিরাপত্তা, পড়াশোনার অগ্রগতি ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এমন একটি বয়সে রয়েছে, যখন তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, যত্ন, সহানুভূতি ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
‎তাই আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনারা তাদের প্রতি একটু বিশেষ নজর রাখবেন। তাদের পড়াশোনার অগ্রগতি, মানসিক অবস্থা, বিদ্যালয়ে চলাফেরা এবং কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
‎আমাদের বিদ্যালয়ের প্রতিটি মেয়ে নিরাপদ পরিবেশে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পড়াশোনা করুক এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাক।
‎বক্তারা অভিভাবকদের জানান, মাদকাসক্তি ও অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। বর্তমানে মাদকাসক্তি আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় হুমকি। মাদক একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, স্বাস্থ্য, পারিবারিক জীবন ও ভবিষ্যৎকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বিদ্যালয় ও আশপাশের পরিবেশ মাদকমুক্ত রাখতে শিক্ষক, অভিভাবক, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
‎একই সঙ্গে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের বিষয়েও আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি। মোবাইলের সঠিক ব্যবহার জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার পড়াশোনায় অমনোযোগ, সময়ের অপচয় এবং বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে।
‎তাই শিক্ষার্থীদের শুধু নিষেধ করলেই হবে না; তাদের বোঝাতে হবে, সচেতন করতে হবে এবং খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
‎শিক্ষকরা জানান, ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আমাদের বিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সম্পর্কে বলতে চাই। পাঠদান চলাকালে সেদিন কয়েকজন ব্যক্তি, যারা নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন, হঠাৎ আমাদের বিদ্যালয়ে এসে শ্রেণিকক্ষে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন, যার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। আমরা ভীত হয়ে পড়ি এবং আমাদের স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো জ্ঞান অর্জনের স্থান। এখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে পড়াশোনা করতে আসে। সেখানে পাঠদান চলাকালে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
‎শিক্ষকরা আরও জানান, আমরা জানতে চাই, কী উদ্দেশ্যে এবং কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সাংবাদিকগণ পাঠদান চলাকালে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন? তাঁদের কার্যক্রমের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেন আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলো? বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
‎তবে তাঁরা স্পষ্টভাবে বলতে চায়, আমরা সাংবাদিকতার বিরোধী নই। আমরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং সত্য প্রকাশের গুরুত্বকে সম্মান করি। সাংবাদিকরা সমাজের নানা অনিয়ম ও অসংগতি তুলে ধরেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা চর্চার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি এবং পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশের প্রতিও যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। কোনো অভিযোগ বা বক্তব্য থাকলে তা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল উপায়ে আলোচনা করা উচিত।
‎শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত করে কিংবা পাঠদান ব্যাহত করে কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি করা কাম্য নয়।
‎সভায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে অভিভাবকদের সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। 
‎