পড়ন্ত এক বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম পুরান ঢাকার ব্যস্ত পথ ধরে। কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে। সেখান থেকে সোজা এগিয়ে চলে এলাম বইপুস্তকের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বাংলাবাজার মোড়ে। বামে ঘুরতেই চোখে পড়ল শ্রীশ দাস লেন। সেই লেনের ঠিক ১ নম্বর বাড়ির বাইরে টাঙানো একটি বিলবোর্ডে লেখা বিউটি বোর্ডিং।

মূল ফটক দিয়ে বিউটি বোর্ডিংয়ে প্রবেশ করতেই প্রথমে চোখে পড়বে একটি খোলা জায়গা, যা অনেকটা ছোট্ট বাগানের মতো। চারপাশে রয়েছে নানা ধরনের গাছপালা। আর মাঝখানে চেয়ার-টেবিল পেতে তৈরি করা হয়েছে বসার উপযোগী মনোরম পরিবেশ।

সেখান থেকে একটু সামনে এগোতেই চোখ আটকে গেল হলুদ রঙের পুরোনো দোতলা ভবনটিতে। ভবনটির সামনে রয়েছে একটি বড় পোস্টার, যাতে রয়েছে বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রহ্লাদ সাহার ছবি। তার ডানদিকেই ছোট একটি উঠান। তার পাশে রয়েছে দোতলায় যাওয়ার পুরোনো সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বারান্দা। ছোট-বড় মিলিয়ে ভবনটিতে রয়েছে মোট ২২টি কক্ষ। কক্ষগুলো আধুনিক হোটেলের মতো না হলেও খুব পরিপাটি ও সাজানো-গোছানো।

ঐতিহ্যবাহী এই পুরোনো ভবনজুড়ে রয়েছে হাজারো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া। একসময় কবি-সাহিত্যিকরা এই বিউটি বোর্ডিংয়ে এসে আড্ডায় মেতে উঠতেন। ভবনটির নিচতলায় রয়েছে একটি খাবার ঘর, যেখানে আজও প্রতিনিয়ত রান্না করা হয় নানা পদের খাবার। খাবার ঘরটিও খুব সাধারণভাবে সাজানো।

সেখানকার কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় এখানে মেঝেতে বসে খাবার খাওয়ার প্রচলন ছিল। তবে এখন আর সেই চল নেই। এখনও এখানে স্টিলের থালা ও গ্লাসে খাবার পরিবেশন করা হয়ে থাকে।

পুরোনো এই ভবনের একটি ছোট্ট ভিন্নধর্মী ঘর আমার নজর কেড়েছে সবচেয়ে বেশি। বিউটি বোর্ডিংয়ের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করে নিচতলায় হাতের বাঁ পাশের কর্নারে থাকা ছোট্ট ঘরটি যেন এক টুকরো শিল্প প্রদর্শনী। সেখানে কারিগররা হাতে এঁকে তৈরি করছেন নানা ধরনের রিকশা-আর্ট, পুরোনো সিনেমার পোস্টার, হারিকেন, রিকশা-আর্টের নকশায় সাজানো দৈনন্দিন ব্যবহার্য নানা সামগ্রী, চশমা, মেয়েদের কানের দুলসহ অনেক কিছু।

জানা গেছে, ১৯৪৯ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহার হাত ধরে এই বোর্ডিং এর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের কালো ইতিহাসের সাক্ষী ছিল এই বিউটি বোর্ডিং। সে বছরের ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিউটি বোর্ডিংয়ে হামলা চালিয়ে প্রতিষ্ঠাতা প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ আরও ১৭ জনকে হত্যা করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহার পরিবার বিউটি বোর্ডিংটি পুনরায় চালু করে। বর্তমানে প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহার ছেলে সমর সাহা প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে রয়েছেন।

একসময় বিউটি বোর্ডিং ছিল কবি-সাহিত্যিকদের অন্যতম আড্ডাস্থল। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীসহ আরও অনেক খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিকের পদচারণায় মুখর ছিল এই বোর্ডিং। কেউ এসেছেন আড্ডা দিতে, কেউবা এখানে বসেই রচনা করেছেন তাদের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম। তবে কালের আবর্তে বিউটি বোর্ডিংয়ের জৌলুস কিছুটা কমে গেলেও, এখনও কবি-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিমনা মানুষজন ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং পরিদর্শনে আসে।

বিউটি বোর্ডিংয়ের দায়িত্বে থাকা সমর সাহা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগের মতো এখন মানুষ বিউটি বোর্ডিংয়ে আসেন না। দর্শনার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিউটি বোর্ডিংয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখন অব্দি সরকার থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সরকারের সাথে অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আমরা আশা করি, শিগগিরই বিউটি বোর্ডিংয়ের ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।