কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্নে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টা। সোমবার প্রদেশটিতে এ বিষয়ে ভোট হচ্ছে।
তবে এটি সরাসরি স্বাধীনতার প্রশ্নে চূড়ান্ত গণভোট নয়; বরং কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে ভবিষ্যতে একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না, তা নির্ধারণ করবে এই ভোট।
আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজে কানাডার অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে। তবে প্রদেশটির বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতা নিয়ে ভোটের আয়োজন করা হয়েছে। প্রায় তিন লাখ মানুষ এ বিষয়ে গণভোট আয়োজনের দাবিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলবার্টার এই ভোট কানাডার জাতীয় ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রদেশটির অধিকাংশ বাসিন্দা কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে থাকলেও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গতি পেয়েছে।
ভোটে কী জানতে চাওয়া হবে?
ভোটারদের সরাসরি ‘কানাডায় থাকা’ অথবা ‘কানাডা থেকে বেরিয়ে যাওয়া’—এমন দুটি বিকল্পের মধ্যে বেছে নিতে বলা হচ্ছে না। বরং তাদের কাছে জানতে চাওয়া হবে, আলবার্টা কানাডার প্রদেশ হিসেবে থাকবে, নাকি দেশটি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে একটি বাধ্যতামূলক প্রাদেশিক গণভোট আয়োজনের জন্য সংবিধান অনুযায়ী আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করবে।
ভোটে মোট ১০টি প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে অভিবাসননীতি, সামাজিক সেবায় অভিবাসীদের প্রবেশাধিকার এবং সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে আরও নয়টি প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রদেশটির অধিকতর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
কেন বিচ্ছিন্ন হতে চায় আলবার্টা?
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষ। প্রদেশটির তেল ও গ্যাসশিল্পের ওপর নির্ভরশীল অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, পরিবেশবিষয়ক বিধিনিষেধ ও পাইপলাইন নির্মাণে বাধার কারণে তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দাবি, আলবার্টা কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বে বিপুল অর্থ জোগালেও বিনিময়ে যথেষ্ট সুবিধা পায় না। একই সঙ্গে অটোয়ায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে বলেও তাদের অভিযোগ।
এই অসন্তোষ কানাডায় ‘ওয়েস্টার্ন এলিয়েনেশন’ নামে পরিচিত দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতার অংশ। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কিছু মানুষের ধারণা, কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তাদের অঞ্চল যথাযথ গুরুত্ব ও প্রতিনিধিত্ব পায় না।
বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতা মিচ সিলভেস্টার ও আইনজীবী জেফরি রাথ। তারা আলবার্টা প্রস্পেরিটি প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত। রাথ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলবার্টার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সাদৃশ্যের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন বলে জানিয়েছেন, যদিও তাদের পরিচয় প্রকাশ করেননি।
আদালতের বাধা ও বিরোধীদের অবস্থান
স্বাধীনতার দাবিতে সংগৃহীত তিন লাখের বেশি স্বাক্ষরের ভিত্তিতে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ আদালতে বাধার মুখে পড়ে। আদিবাসী ফার্স্ট নেশনস জনগোষ্ঠীর ভূমি স্বাধীনতার ফলে কীভাবে প্রভাবিত হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ না করায় আদালত উদ্যোগটির বিরুদ্ধে রায় দেন। আলবার্টা সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
অন্যদিকে, স্বাধীনতার বিরোধিতায় ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ নামে একটি উদ্যোগে চার লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।
প্রিমিয়ার স্মিথ বলেছেন, তিনি কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেবেন। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও আলবার্টাকে কানাডার জ্বালানি খাতের ভবিষ্যতের কেন্দ্রে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিরোধী কনজারভেটিভ নেতা পিয়েরে পলিয়েভরও দেশের ঐক্য বজায় রাখার পক্ষে।
স্বাধীনতার সম্ভাবনা কতটা?
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন দেখা গেছে। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত লেজার জরিপে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা আলবার্টাকে কানাডার অংশ হিসেবেই রাখতে চেয়েছেন। বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ভবিষ্যতে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন ২০ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ; সিদ্ধান্তহীন ছিলেন ৭ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে সিবিসির জন্য পরিচালিত জ্যানেট ব্রাউন ওপিনিয়ন রিসার্চের জরিপেও ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে এবং ২৩ শতাংশ বিচ্ছিন্নতার পক্ষে মত দেন।
ভোটে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে সিদ্ধান্ত এলেও আলবার্টা সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। প্রথমে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। স্মিথের মতে, সেই গণভোট ২০২৭ সালেও হতে পারে।
ফলে আলবার্টার বর্তমান ভোটে স্বাধীনতার প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে না; বরং কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাব্য দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে এগোনো হবে কি না, সেটিই নির্ধারিত হবে। সূত্র: বিবিসি