সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা-১ এবং তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলাধীন যাদুকাটা-২ বালুমহালের সরেজমিন দখল ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করেছে প্রশাসন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে বালুমহাল দুটির সীমানা নির্ধারণ ও দখল হস্তান্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দখল বুঝে পাওয়ার পর মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) থেকে বালু উত্তোলন কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন ইজারাদার মেসার্স তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের স্বত্বাধিকারী মো. নাছির মিয়া।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সুনামগঞ্জের রাজস্ব (এসএ) শাখার ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের পৃথক দুটি স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে বালুমহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম নেওয়া হয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৪৩৩ বাংলা সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমতিপত্রে মেয়াদ ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৭ পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে।

দখল হস্তান্তরকালে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবী বলেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহালের দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা ও ইজারার শর্ত মেনেই বালু উত্তোলন করতে হবে। প্রশাসন বিষয়টি নিয়মিত নজরদারিতে রাখবে।

তিনি বলেন, বালুমহালের জন্য নির্ধারিত তফসিলভুক্ত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলন করা যাবে না। নদীর পাড় কাটারও কোনো সুযোগ নেই। কেউ নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করলে কিংবা ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইউএনও আরও জানান, ইজারার শর্ত অনুযায়ী ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করতে হবে। রাতের বেলায় বালু উত্তোলন করা যাবে না। শর্তবহির্ভূত যন্ত্রপাতি ব্যবহারও গ্রহণযোগ্য হবে না। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত নৌকা বা যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে তা জব্দ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নজরদারির ক্ষেত্রে জনবল ও লজিস্টিক সংকটের বিষয়টি আলোচনায় এলে ইউএনও জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বালুমহাল দুটির ইজারাদার মেসার্স তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের স্বত্বাধিকারী মো. নাছির মিয়া বলেন, নানা জটিলতা ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা বালুমহাল দুটির দখল পেয়েছেন। আদালতে রিট ও স্থগিতাদেশসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের পর দখল বুঝে নিতে এসেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

ইজারার মেয়াদ প্রসঙ্গে নাছির মিয়া বলেন, বালুমহাল দুটির জন্য ১৯৫ দিনের ইজারা মেয়াদ রয়েছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে ২০ দিন বালু উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সোমবার দখল বুঝে পাওয়ার পর মঙ্গলবার থেকে শ্রমিকদের নিয়ে বালু উত্তোলন কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, যাদুকাটা নদীর ওপর এলাকার বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জীবিকা নির্ভরশীল। বালু উত্তোলন বন্ধ থাকায় শ্রমিকেরা অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নিয়ম ও শর্ত মেনে বালুমহাল পরিচালনা করতে চান তাঁরা। এ জন্য প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বালু উত্তোলন কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পুলিশি সহায়তা চাওয়ার কথা জানিয়েছেন ইজারাদার। প্রয়োজনে এলাকায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের জন্যও আবেদন করবেন বলে জানান তিনি।

নাছির মিয়ার দাবি, নদীর দুই পাড়ে তাঁদের ২০০ থেকে ৩০০ জন স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। প্রয়োজন হলে এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ জন করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা বা অনিয়ম দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদুকাটা-১ বালুমহালের ধার্য দর, আয়কর ও ভ্যাটসহ মোট পরিশোধিত অর্থ ১৫ কোটি ৮৩ লাখ ১৫ হাজার ৬৯ টাকা। অন্যদিকে, যাদুকাটা-২ বালুমহালের জন্য মোট অর্থের পরিমাণ ২৬ কোটি ৮৩ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ টাকা। দুই বালুমহালের জন্য নথিতে উল্লিখিত মোট অর্থের পরিমাণ ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা।

দখল হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে বালুমহাল দুটিতে বালু উত্তোলন শুরুর পথ তৈরি হয়েছে। তবে নদীর দুই পাড় রক্ষা, নির্ধারিত সীমানা বজায় রাখা, অনুমোদিত পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন এবং পরিবেশগত ক্ষতি প্রতিরোধ নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যাদুকাটা নদীর পরিবেশ ও দুই পাড়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নদীনির্ভর শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।