শেলাবুনিয়ায় নবম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে র‍্যালি, স্মরণসভা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু, ইতালীয় নাগরিক, অনুবাদক ও সাহিত্যপ্রেমী ফাদার মারিনো রিগনের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন মোংলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁর নবম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মোংলার শেলাবুনিয়ায় র‍্যালি, স্মরণসভা ও সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে ফাদার মারিনো রিগন মৃত্যুবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটির আয়োজনে এসব কর্মসূচি পালিত হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় শেলাবুনিয়ায় তাঁর সমাধি চত্বরে আয়োজিত স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন ফাদার রিগন শিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সেন্ট পলস ধর্মপল্লির পালক পুরোহিত ফাদার ফিলিপ মণ্ডল।

স্মরণসভায় বক্তব্য দেন মোংলা নাগরিক সমাজের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. নূর আলম শেখ, সেন্ট পলস উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ফ্রান্সিস সুদান হালদার, মনীন্দ্রনাথ হালদার, বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক চিরঞ্জিত সরকার, সেবা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মিনা হালদার, উদয়ন সমাজ সংঘের জানে আলম বাবু, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মোল্লা আল মামুন, সঞ্জয় সরদার, হিউবার্ট সরদার ও পলাশ হালদারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

বক্তারা বলেন, ফাদার মারিনো রিগন ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে এ দেশের মানুষের সঙ্গে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল। তাঁর মননে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর অন্তরে ছিল লালন সাঁইয়ের দর্শন। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তুলতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

বক্তারা আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৪৮টি বই এবং লালন সাঁইয়ের সাড়ে তিন শ গান ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন ফাদার রিগন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে ইতালির পাঠক-শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ইতালিতে বাংলাদেশের এক অনানুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক দূত হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আলোচনা সভা শেষে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফাদার রিগনের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল সেন্ট পলস ধর্মপল্লি, সেন্ট পলস উচ্চবিদ্যালয়, ফাদার রিগন শিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, মোংলা নাগরিক সমাজ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও সেবা সংস্থাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া সেন্ট পলস উচ্চবিদ্যালয়ের উদ্যোগে একটি র‍্যালি বের করা হয়।

উল্লেখ্য, ফাদার মারিনো রিগন দীর্ঘ পাঁচ দশক মোংলা অঞ্চলে যাজকীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তার, সমাজ উন্নয়ন এবং শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করেছেন। এ অঞ্চলে সেন্ট পলস উচ্চবিদ্যালয়সহ ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেন্ট পলস হাসপাতাল ও সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

বাংলাদেশের প্রতি অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ২০১২ সালে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা পদকে ভূষিত করা হয়।

২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইতালিতে মৃত্যুবরণ করেন ফাদার মারিনো রিগন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী, মৃত্যুর প্রায় এক বছর পর বাংলাদেশ সরকার ইতালি থেকে তাঁর মরদেহ দেশে নিয়ে আসে। পরে মোংলার শেলাবুনিয়ায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

ফাদার রিগনের মৃত্যু হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, সমাজ উন্নয়ন এবং বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও অবদান আজও মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।