বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলায় মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অভাবে আত্মহত্যার মত অকাল মৃত্যুর প্রবণতা বহুমাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। উক্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখানে নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর-এই নয় মাসে উপজেলায় আত্মহত্যা করে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন নারী-পুরুষ। একই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়ে গুরুতর আহত হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও ২৩২ জন। তাঁদের মধ্যে ১২ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে ১১ জন।
আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের শারীরিক চিকিৎসা দেওয়া গেলেও তাঁদের নেপথ্যে মানসিক সংকট শনাক্ত বা নিরাময়ে উপজেলায় নেই কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সাইকোলজিস্ট কিংবা প্রশিক্ষিত কাউন্সিলর। ফলে চিকিৎসা পেয়ে শারীরিক সুস্থতা মিললেও রয়ে যাচ্ছে ফের একই পথে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি। ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মডেল থানা ও বিভিন্ন ক্লিনিক থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, আত্মহত্যার চেষ্টায় চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের বয়স ৯ থেকে ৭০ বছর। তাঁদের ৮৭ শতাংশই নারী এবং ৭০ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসেই বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়ে আহত ২৭ জন এবং গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করা দু’জন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকায় পাঠানো হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়। এই দুজনসহ নয় মাসে ফকিরহাটে মোট ২৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। উপজেলার স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে-পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের টানাপড়েন, যৌন নিপীড়ন, বেকারত্ব, আর্থসামাজিক সংকট, মানসিক চাপ ও হতাশা মানুষকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সঠিক সময়ে মানসিক সহায়তা না পাওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে বিশেষ করে বাহিরদিয়া-মানসা, নলধা-মৌভোগ, লখপুর এবং ফকিরহাট সদর ইউনিয়নে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
এ বিষয়ে ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান সাগর বলেন, “আমাদের এখানে আত্মহত্যার চেষ্টার পর নিয়ে আসা রোগীদের শারীরিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে কেউ একবার আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে গেলেও তাঁর মধ্যে বারবার একই প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আত্মহত্যা কমাতে পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা প্রয়োজন।” তিনি আরও জানান, “উপজেলায় কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রশিক্ষিত কাউন্সিলর না থাকায় রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি শেষ পর্যন্ত উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।” এ বিষয়ে ফকিরহাট ইউএনও মোঃ রোকনুজ জামান বলেন, “একটি উপজেলায় এত মানুষের আত্মহত্যার প্রবণতা সত্যিই উদ্বেগজনক।” তিনি জানান, “কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ ও হতাশা দূর করতে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, নারী ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা এবং চিকিৎসকদের সমন্বয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে।”
উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে সভা- সেমিনারের মাধ্যমে সচেতনতার উপর গুরুত্বআরোপ করেন সচেতন মহল।