মস্তিষ্কের সংকেত শনাক্তকারী প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা, কাজে লাগতে পারে চিন্তানিয়ন্ত্রিত ডিভাইসেও
মানব মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও পেশির সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম বিশেষ সেন্সর প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী স্টার্টআপ সোনেরা অধিগ্রহণ করেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন গবেষক ড. সায়েফ সালাহউদ্দিন। তাঁর গবেষণাসংশ্লিষ্ট এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অ্যাপলের পরিধানযোগ্য ডিভাইস এবং চিন্তার মাধ্যমে যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম অ্যাপল ইনসাইডারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোনেরার উদ্ভাবিত সেন্সর প্রযুক্তি ভবিষ্যতের অ্যাপল ওয়াচসহ বিভিন্ন পরিধানযোগ্য ডিভাইসে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে স্নায়ু ও পেশিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং সহায়ক প্রযুক্তি তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিগ্রহণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সোনেরাকে অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। তবে অ্যাপল কিংবা সোনেরা—কোনো পক্ষই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
মস্তিষ্কের সংকেত শনাক্তে বিশেষ প্রযুক্তি
২০১৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলিতে অধ্যয়নকালে নিশিতা ডেকা ও ডমিনিক লাবানোস্কি সোনেরা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে অধ্যাপক সায়েফ সালাহউদ্দিন তাঁদের সঙ্গে সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যুক্ত হন। তিনি লাবানোস্কির পিএইচডি গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক নাম ছিল সোনেরা ম্যাগনেটিকস। ২০২৩ সালে স্টার্টআপটি ১ কোটি ১০ লাখ ডলারের অর্থায়ন পায়। প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবিত ‘এসওয়ান’ নামের বিশেষ চিপটি মূলত পেশির নড়াচড়া শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়। উদ্ভাবকদের দাবি, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চৌম্বকীয় সংকেতও শনাক্ত করা সম্ভব।
প্রচলিত কিছু প্রযুক্তিতে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত পরিমাপ করা হয়। তবে মাথার খুলির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এসব সংকেত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, সোনেরার প্রযুক্তি চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্তের ওপর গুরুত্ব দেয়। এর ফলে ভবিষ্যতে ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা মস্তিষ্কের সংকেতের মাধ্যমে যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে উন্নত করা গেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক ডিভাইস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা হাত বা শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গ নড়াচড়া করতে পারেন না, তাঁদের জন্য মস্তিষ্ক বা পেশির সংকেত শনাক্ত করে কৃত্রিম অঙ্গ কিংবা অন্যান্য যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া মুখে কথা না বলে চোয়ালের পেশির নড়াচড়া শনাক্ত করে ডিজিটাল ডিভাইসে নির্দেশ দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, নির্ভুলতা ও বাস্তব ব্যবহারের সক্ষমতা আরও গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
বুয়েট থেকে বার্কলের গবেষণাগারে
ড. সায়েফ সালাহউদ্দিন ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। চৌম্বকীয় সেন্সর ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর গবেষণা সোনেরার উদ্ভাবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল আর্লি ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড ফর সায়েন্টিস্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ সম্মাননায় ভূষিত করেন। ক্যারিয়ারের শুরুর পর্যায়ে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।
অ্যাপলের আগ্রহ কেন
অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছে। অ্যাপল ওয়াচে ইতিমধ্যে হৃদ্স্পন্দন পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্ট সুবিধা রয়েছে। এর সঙ্গে মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও পেশির সংকেত শনাক্তের প্রযুক্তি যুক্ত হলে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং ডিভাইস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সোনেরার প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অ্যাপলের ভিশন প্রো কিংবা অন্যান্য ডিভাইসের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে ব্যবহারকারীরা প্রচলিত স্পর্শভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিকল্প পদ্ধতিতে নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে এ ধরনের ব্যবহার এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে; অ্যাপল প্রযুক্তিটি ঠিক কীভাবে কাজে লাগাবে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।
অধিগ্রহণের আর্থিক শর্তও প্রকাশ করা হয়নি। বিভিন্ন আলোচনায় প্রায় ২ কোটি ডলারের অঙ্ক উঠে এলেও নির্ভরযোগ্য আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া সেটিকে চূড়ান্ত অধিগ্রহণমূল্য হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অবদান রাখার ক্ষেত্রে সায়েফ সালাহউদ্দিনের পথচলা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ অর্জন করায় মেধা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।