স্থায়ী বাঁধ ও নদী পুনঃখননই হতে পারে হাজারো পরিবারের সুরক্ষার পথ।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলেছে মহারশি নদী। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা এই নদী একদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও কৃষির সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল আর নদীভাঙনের কারণে পরিণত হয়েছে হাজারো মানুষের উদ্বেগের কারণ হিসেবে। নদীর পানি বাড়লেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, পুকুর, শাকসবজির ক্ষেত ও বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটে সাধারণ মানুষের।
ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর থেকে বনগ্রাম সড়কের পাশ দিয়ে প্রবাহিত মহারশি নদী স্থানীয় যোগাযোগ, কৃষি ও জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বনগ্রাম হয়ে তিনানী বাজার, নন্নী বাজার ও মধুটিলা ইকোপার্কসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতের পথের আশপাশের জনপদও এই নদী ও এর পানিপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু নদীর দুই তীরের মানুষের কাছে বর্ষা মানেই অনিশ্চয়তা। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে হঠাৎ নেমে আসা পাহাড়ি ঢল যখন নদীতে প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে, তখন দুর্বল বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায় বাড়িঘর, ডুবে যায় ফসলের মাঠ, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুকুরের মাছ এবং নষ্ট হয় পরিবারের সারা বছরের পরিশ্রম।
পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত জনপদ
মহারশি নদীর ভাঙন শুধু নদীর তীরের মাটি কেড়ে নেয় না; কেড়ে নেয় মানুষের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
নদীর আশপাশে বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন করেন কৃষকেরা। অনেক পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে এসব জমি, পুকুর ও গৃহস্থালির সম্পদের ওপর। পাহাড়ি ঢলে পানি ঢুকে পড়লে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়, মাছের পুকুর ভেসে যায়, বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য।
২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর বাজারসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনায় নদীতীরবর্তী অন্তত ১০টি ঘর পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে যায় এবং শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একই বছরের সেপ্টেম্বরে পাহাড়ি ঢলে মহারশি নদীর বাঁধের একাধিক স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় ৬৫০ হেক্টর রোপা আমন সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছিল; পাশাপাশি ৯১৫ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৮৬ হেক্টর সবজিখেত পানির নিচে ছিল।
এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, নদীভাঙন ও পাহাড়ি ঢলের ক্ষতি কেবল কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদন, স্থানীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
ঝুঁকিতে মানুষের জীবন ও জীবিকা
নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় শিকার নদীতীরবর্তী সাধারণ মানুষ। যাঁরা বছরের পর বছর কষ্ট করে একটি বাড়ি তৈরি করেন, কয়েক বিঘা জমিতে ফসল ফলান কিংবা ছোট একটি পুকুরে মাছ চাষ করে সংসার চালান, তাঁদের কাছে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল একটি ভয়াবহ বিপর্যয়।
প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়লে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রুত পানি বাড়লে গবাদিপশু রক্ষা করা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরানো এবং নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই মহারশি নদীর সমস্যাকে শুধু বাঁধ মেরামতের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, কৃষকের ভবিষ্যৎ, শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবন এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
নাব্যতা সংকট ও অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা
স্থানীয়ভাবে নদীটির অন্যতম সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে নাব্যতা হ্রাস, নদীর প্রবাহপথ সংকুচিত হওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে বাঁধের দুর্বলতা।
২০২৬ সালের ২৫ জুন প্রকাশিত এক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন নদী খনন না হওয়া এবং নদীর ভেতরে চর ও অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে মহারশির পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নেমে যেতে না পেরে আশপাশের এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং দুই তীরে পরিকল্পিত ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, পানিপ্রবাহের ধরন, নদীর গতিপথ এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। অপরিকল্পিতভাবে নদীর কোনো অংশে বাধা সৃষ্টি করলে পানি অন্য অংশে গিয়ে নতুন ভাঙন বা জলাবদ্ধতার কারণ হতে পারে।
স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে প্রায় ৪৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকার প্রস্তাব
মহারশি নদীর সমস্যা সমাধানে সরকারি পর্যায়ে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর শেরপুর পানি উন্নয়ন বিভাগ থেকে মহারশি নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত ও পুনর্বাসন এবং নদী পুনঃখননের জন্য প্রায় ৪৮ কোটি ৬৪ লাখ ২৩ হাজার টাকার একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করে পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য পাঠানো হয়।
প্রস্তাবিত ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ২২ কোটি ২৯ লাখ ২ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল ২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত ও পুনর্বাসনের জন্য। অন্যদিকে, প্রায় ২৬ কোটি ৩৫ লাখ ২১ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল ১৭ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের জন্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে গঠিত একটি কারিগরি কমিটি ঝিনাইগাতী উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের এলাকাগুলো পরিদর্শন করে।
তবে প্রস্তাবিত ব্যয়, প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং বাস্তবায়ন—এগুলো পৃথক ধাপ। প্রকল্পটির বর্তমান অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সর্বশেষ অবস্থা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সংসদে বিষয়টি তুলে ধরেছেন এমপি মাহমুদুল হক রুবেল
মহারশি নদীর স্থায়ী সমাধানের দাবি স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের। এই সমস্যা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার বিষয়েও উদ্যোগের কথা জানা গেছে।
২০২৬ সালের ২৫ জুন প্রকাশিত সংবাদে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, তিনি মহারশি নদীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছেন। একই প্রতিবেদনে তিনি প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াগত কাজ শেষ হওয়ার কথা জানান এবং বাকি কাজ সম্পন্ন হলে দরপত্র আহ্বানের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। চলতি অর্থবছরে কাজ শুরু হওয়ার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে, ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, সংসদ সদস্যের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে রামেরকুড়া এলাকায় মহারশি নদীর তীরবর্তী ভাঙনস্থলে ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জিওব্যাগে বালু ভরাটের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই উদ্যোগগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে নদীর বিভিন্ন স্থানে বারবার ভাঙন ও বন্যার অভিজ্ঞতা বলছে, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অংশ মেরামতের পাশাপাশি পুরো নদীব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
শুধু বাঁধ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা
মহারশি নদীকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা এখন একটি স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান। এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ: নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে কারিগরি সমীক্ষার ভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসন করতে হবে। কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, নদী পুনঃখনন ও পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা: প্রয়োজনীয় সমীক্ষার ভিত্তিতে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর সুরক্ষা: নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধারব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা জোরদার করতে হবে।
চতুর্থত, কৃষকের ক্ষতি কমানো: বন্যার পূর্বাভাস দ্রুত পৌঁছে দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: বরাদ্দ, দরপত্র, নির্মাণকাজের অগ্রগতি এবং কাজের মান সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত তথ্য জানানো প্রয়োজন।
মহারশি নদীর স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি
মহারশি নদী ঝিনাইগাতীর প্রকৃতি, কৃষি ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নদীকে ঘিরে যেমন রয়েছে সম্ভাবনা, তেমনি রয়েছে দীর্ঘদিনের বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি।
প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলে কৃষকের ফসল নষ্ট হবে, পরিবার বসতভিটা হারানোর আতঙ্কে থাকবে, আর গুরুত্বপূর্ণ জনপদ প্লাবিত হবে—এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চান নদীতীরবর্তী মানুষ।
সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেলের উদ্যোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, টেকসই নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ।
মহারশি নদীর দুই তীরের মানুষের দাবি তাই স্পষ্ট—তাঁরা সাময়িক আশ্বাস নয়, চান কার্যকর উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। কারণ একটি নদীর ভাঙন শুধু মাটি কেড়ে নেয় না; কেড়ে নেয় মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
মহারশি নদীর স্থায়ী সমাধান মানে শুধু একটি নদীকে রক্ষা করা নয়—রক্ষা করা ঝিনাইগাতীর মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।