দিনাজপুরের বীরগঞ্জে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’ এখন রূপ নিয়েছে মিলনমেলায়। একসময় জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার বিশেষ আয়োজন হিসেবে পরিচিত এই মেলা আধুনিক সময়ে হারিয়েছে সেই পুরোনো রীতি। এখন মেলাটি পরিণত হয়েছে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, আনন্দ ভাগাভাগি ও আদিবাসী সংস্কৃতি উদ্যাপনের এক ঐতিহ্যবাহী উৎসবে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বীরগঞ্জের গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আয়োজনে বসে এ মেলা। শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরদিন বসা এই মেলায় সকাল থেকেই সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের সমাগম ঘটে। বিকেল ৩টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলায় বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়।
জীবনসঙ্গী খোঁজার প্রথা এখন অতীত
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই মেলার প্রচলন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। কেউ কেউ এর বয়স দুই শতাব্দীরও বেশি বলে মনে করেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এ মেলা একসময় ‘বউমেলা’ নামে পরিচিত ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তন, শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তনের কারণে জীবনসঙ্গী খোঁজার সেই পুরোনো প্রথা এখন আর মেলার মূল আকর্ষণ নয়।
মেলার আয়োজক আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি যোসেফ হেমরম বলেন, “কেউ বলেন, এই মেলার বয়স ২০০ বছরের বেশি, আবার কেউ বলেন অনেক দিন ধরে চলছে। মেলাটি কবে শুরু হয়েছে, তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারেন না। একসময় জীবনসঙ্গী খোঁজার কারণে এর নাম বউমেলা হলেও বর্তমানে সেই প্রথা আর নেই। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা এখন শিক্ষিত হচ্ছে এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তাই আমরা দূরদূরান্তে থাকা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য এই মেলার আয়োজন করে আসছি।”
বর্ণিল সাজে সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা
সরেজমিনে দেখা যায়, মেলায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি হিন্দু, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা পরিবারের বড়দের সঙ্গে মেলায় আসেন। তরুণীদের অনেকেই বাহারি ফুলের সাজ ও রঙিন পোশাকে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরেন।
মেলায় বসে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দোকান। কাঁচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল, ঝিনুকের মালা, মাটির তৈরি খেলনা এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত দা, কুড়াল, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা সামগ্রী নিয়ে দোকানিরা পসরা সাজান। পাশাপাশি বিভিন্ন খাবারের দোকানেও ছিল ক্রেতাদের ভিড়।
মেলার একপর্যায়ে বাজনার তালে তালে পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গান। সব মিলিয়ে মেলাটি পরিণত হয় নানা বয়সী মানুষের আনন্দ-উৎসবে।
আলোচনা সভায় অতিথিদের বক্তব্য
মেলার আয়োজক আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি যোসেফ হেমরমের সভাপতিত্বে বিকেলে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমা খাতুন, দিনাজপুর জেলা বিএনপির উপদেষ্টা, চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক ও আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু, পৌর বিএনপির সভাপতি ও পৌর মেয়র প্রার্থী আলহাজ মো. আমিরুল বাহার, আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা ও নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস, মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমান চৌধুরী শাহিন এবং বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী নেতা শীতল মার্ডী।
নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস বলেন, আগে সামাজিক বিধিবিধান কঠোর থাকলেও বর্তমানে অনেকেই প্রচলিত আইন ও নিয়মনীতি মেনে বিয়ে করছেন। মেলাকে ঘিরে এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করা হয়। এভাবেই ঐতিহ্যবাহী বউমেলা ধীরে ধীরে মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।
বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী নেতা শীতল মার্ডী বলেন, “একসময় এই মেলার নাম ছিল বউমেলা। এখন এটি আদিবাসীদের মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত। পূর্বপুরুষেরা এই মেলার প্রচলন করেছিলেন। আমরা তাঁদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তবে ঠিক কবে থেকে মেলাটি শুরু হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, যুগ যুগ ধরে এই মেলা চলে আসছে। আমরা তাঁদের পথ অনুসরণ করে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখছি।”
ঐতিহ্য ধরে রাখাই এখন মূল লক্ষ্য
সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক রীতিনীতি ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের পদ্ধতি। তবে সেই পরিবর্তনের মধ্যেও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে বীরগঞ্জের এই মেলা। জীবনসঙ্গী খোঁজার পুরোনো পরিচিতি পেছনে ফেলে বউমেলা এখন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন, সংস্কৃতি চর্চা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মেলাকে ঘিরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, সময় বদলালেও ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের টান এখনো অটুট।