এক টাকায় চারটি লাউ। এক কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই থেকে তিন টাকায়। উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে ফসল তোলার শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচও উঠছে না। ফলে জমিতে ফলনভরা লাউয়ের গাছ কেটে ফেলছেন কৃষক। গাছেই পেকে নষ্ট হচ্ছে পেঁপে।
অথচ রাজধানীর বাজারে একটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ টাকায়। পেঁপের খুচরা দামও কেজিপ্রতি প্রায় ৩০ টাকা। উৎপাদক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায়ে দামের এই বড় ব্যবধান কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এবার লাউয়ের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় স্থানীয় বাজারে দর ভয়াবহভাবে কমে গেছে। কোথাও চারটি লাউ বিক্রি হচ্ছে এক টাকায়, আবার কোথাও প্রতিটি লাউয়ের দাম দুই থেকে পাঁচ টাকা। অথচ স্থানীয় খুচরা বাজারে একটি লাউয়ের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা।
আটোয়ারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র তিন হাজার টাকা। এই অর্থে শ্রমিকের মজুরি দেওয়াও সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
দুলাল ইসলাম বলেন, দুই থেকে তিন হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনার টাকা হয় না। লোকসানের কারণে শেষ পর্যন্ত বাগান কেটে ফেলেছেন। কিছু লাউ গরুকে খাওয়াচ্ছেন। তাঁর প্রশ্ন, এত কষ্ট করে ফসল ফলিয়ে কৃষক যদি ন্যায্য দাম না পান, তাহলে চাষ করবেন কীভাবে?
একই উপজেলার ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার কৃষক আনসারুল ইসলাম ১০ দিন ধরে লাউয়ের বাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন। সার-কীটনাশকের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বাড়লেও লাউয়ের দাম মিলছে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পর্যন্ত। একজন শ্রমিককে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি দিতে হয়। ফলে বাগানে পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়াকে লোকসান আরও বাড়ানোর শামিল মনে করছেন তিনি।
পেঁপের বাজারেও ধস
পেঁপের বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় এবার প্রায় ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অনুকূল আবহাওয়া, উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তার এবং আবাদ বাড়ায় এবার উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পেঁপে বাজারে আসায় দাম নেমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে।
সিংগাইরে জমি থেকে পেঁপে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি মাত্র দুই থেকে তিন টাকায়। এ দামে পেঁপে বিক্রি করে জমির ভাড়া, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের খরচ তোলা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কৃষক গাছ থেকে পেঁপে তুলছেন না। কোথাও পাকা পেঁপে গাছেই নষ্ট হচ্ছে। আবার কোথাও গাছ কেটে বিকল্প ফসল চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা।
সিংগাইরের গোপালনগর গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন দুই বিঘা জমিতে পেঁপে চাষে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। কিন্তু ক্রেতারা কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকার বেশি দিতে চাইছেন না। এই দামে শ্রমিকের মজুরি ও ভ্যানভাড়াই দেওয়া কঠিন বলে জানান তিনি।
একই উপজেলার কৃষক তাজুল সিকদার লোকসানের কারণে দুই বিঘা জমির পেঁপেগাছ কেটে ফেলেছেন। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে খরচের সামান্য অংশও ফেরত না পাওয়ায় তিনি এখন অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। কৃষকদের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে পেঁপে চাষে আগ্রহ কমে যাবে।
ঢাকার বাজারেও কম দাম, বিপাকে ব্যবসায়ীরা
ঢাকার পাইকারি বাজারেও প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কাঁচা পেঁপে কেজিপ্রতি চার থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে খুচরা বাজারে পেঁপের দাম কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
গত বছরের বেশি দামের অভিজ্ঞতায় এবার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় উৎপাদন ও আগাম বিনিয়োগ বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু এবার ফলন ও সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজারের হিসাব পুরোপুরি উল্টে গেছে।
কারওয়ান বাজারের পেঁপে ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান জানান, গত বছর ভালো দাম পাওয়ার অভিজ্ঞতায় এবার পাঁচ জেলার কৃষকদের তিন কোটি টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। তাঁর আশা ছিল, এবারও বাজার ভালো থাকবে। কিন্তু দাম পড়ে যাওয়ায় সেই বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে কেজিপ্রতি ছয় থেকে সাত টাকায় পেঁপে বিক্রি করেছেন। একপর্যায়ে দাম নেমে আসে চার টাকায়। অথচ চুয়াডাঙ্গা ও যশোর থেকে ঢাকায় পেঁপে আনতেই কেজিপ্রতি পরিবহন খরচ পড়ে চার টাকার বেশি। তিন কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার পর এর ৫০ লাখ টাকাও ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ব্যাংক ঋণ ও সুদের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে তিন টন পেঁপে কারওয়ান বাজারে এনেছিলেন অজি উল্যাহ। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, জমির ভাড়া, বীজ, সারসহ উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ যোগ হয় আরও প্রায় তিন টাকা। অর্থাৎ ঢাকার বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি কেজি পেঁপেতে খরচ দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ তাঁকে পেঁপে বিক্রি করতে হয়েছে কেজিপ্রতি ছয় থেকে আট টাকায়। ফলে প্রতি কেজিতে লোকসান হয়েছে অর্ধেকেরও বেশি।
কারওয়ান বাজারে ২০ বছর ধরে সবজি বিক্রি করা আবু বকর বলেন, পেঁপের দাম এতটা কমে যেতে তিনি আগে কখনো দেখেননি।
পাইকারি ও খুচরা বাজারে বড় ব্যবধান
এদিকে আগাম শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও সব পণ্যের দাম একসঙ্গে কমেনি। বগুড়ার মহাস্থান পাইকারি বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোলের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা থেকে কমে ২৫-৩০ টাকা, করলা ৫৫ থেকে ৪৫ টাকা, ফুলকপি ৭০-৮০ থেকে ৬০ টাকা এবং মুলা ৩৫ থেকে ২২ টাকায় নেমেছে।
তবে বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে পটোল ৫০-৬০ টাকা, করলা ৮০ টাকা এবং ফুলকপি ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, বাজারে শীতের সবজি চলে এসেছে। ফলে মানুষের আগ্রহ এখন আগাম শীতকালীন সবজির দিকে। লাউ ও পেঁপে সারা বছর পাওয়া যায় বলে এসব পণ্যের প্রতি আগ্রহ কিছুটা কমেছে।
তিনি বলেন, লাউ ও পেঁপের আবাদ এবং উৎপাদন—দুটিই বেড়েছে। অনেক জেলায় উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের পেঁপে ও লাউয়ের চাষ বেড়েছে। বেশি জমিতে আবাদ ও ভালো ফলনের কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।
ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা চান বিশেষজ্ঞ
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, লাউ ও পেঁপের বাজারের চিত্র কৃষিপণ্যের বিপণনব্যবস্থার বড় সংকট সামনে এনেছে। উৎপাদন বাড়লেও সেই পণ্য লাভজনক দামে বিক্রির নিশ্চয়তা নেই কৃষকের।
তিনি বলেন, দ্রুত পচনশীল পণ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে দাম বাড়ার অপেক্ষা করার সুযোগ কৃষকের নেই। বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দ্রুত বিক্রি করতে গিয়ে তাঁকে লোকসান মেনে নিতে হয়। সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দূরের বাজারে পণ্য পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এই ঝুঁকি থেকেই যায়।
ড. জাহাঙ্গীর আলম খান আরও বলেন, কম দামে পণ্য পেয়ে ভোক্তার সাময়িক স্বস্তি মিললেও উৎপাদক যদি উৎপাদন খরচই তুলতে না পারেন, তাহলে পরের মৌসুমে সেই ফসল চাষে তাঁর আগ্রহ ও সক্ষমতা—দুটিই কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তিনি ভারতের ‘মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস’ ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের নির্দিষ্ট দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি ‘ফসল বীমা কর্মসূচি’ও রয়েছে। প্রায় ২৩টি পণ্য সরকার কিনে মজুত করে এবং মৌসুম শেষে বাজারে ছাড়ে। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষিমূল্য কমিশন’ গঠনের প্রস্তাবও দেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ।