পুলিশের কাছ থেকে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজুল আলম ওরফে শাহীনকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের ডেকুয়ারচর ও সরিষা গ্রাম। পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযান এড়াতে অধিকাংশ পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এ ঘটনায় করা মামলায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— সরিষা ইউনিয়ন বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ মিলন (৫০) ও নিষিদ্ধঘোষিত ঈশ্বরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নয়ন মণ্ডল। উপজেলার সরিষা ও আশ্রবপুর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার রাতে ওয়াসিম মিয়া (২৬) ও এমদাদুল হক (৪৫) নামে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ নিয়ে এ মামলায় মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলো।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দিবাগত রাতে ডেকুয়ারচর ও সরিষা গ্রামে অর্ধশতাধিক পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্য অভিযান চালান। নতুন করে দুজন গ্রেপ্তারের পর গ্রাম দুটিতে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকে রাতে বাড়িতে থাকছেন না। কেউ কেউ দিনে চুপিসারে বাড়িতে এসে আবার নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার বিকেলে সরিষা ডেকুয়ারচর দাখিল মাদরাসা মাঠে রঙতরঙ্গ সংগঠনের উদ্যোগে বিবাহিত ও অবিবাহিতদের মধ্যে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। খেলা দেখতে সেখানে উপস্থিত হন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল আলম ওরফে শাহীন (৩০)। তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
খেলার মাঠে শাহীনের অবস্থানের খবর পেয়ে আঠারবাড়ী রায়েরবাজার পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মাজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নেওয়ার পথে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় পুলিশের সদস্যদের মারধর এবং তাদের ব্যবহৃত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর করে শাহীনের হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
এ ঘটনায় আঠারবাড়ী রায়েরবাজার পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের এসআই মো. মাজহারুল ইসলাম বাদী হয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় ২৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
শুক্রবার রাতেই অভিযান চালিয়ে ওয়াসিম মিয়া ও এমদাদুল হককে গ্রেপ্তার করে পরদিন আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরে শনিবার দিবাগত রাতে নতুন করে অভিযান চালিয়ে নূর মোহাম্মদ মিলন ও নয়ন মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডেকুয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম (৫০) ও আব্দুল মান্নান বলেন, পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া ও মারধরের ঘটনার পর গত দুই দিন ধরে এলাকাবাসী গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন। তাদের ভাষ্য, গ্রামে এখন কোনো পুরুষ লোক নেই। তারা রাতে বাড়িতে থাকছেন না। দিনে চুপিসারে বাড়িতে এসে আবার নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন।
শফিকুল ইসলাম ও আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এভাবে চলতে পারে না। যারা প্রকৃত অপরাধী, তাদের গ্রেপ্তার করা হোক। কিন্তু ঢালাওভাবে নিরপরাধ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হলে আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা উঠে যাবে।’
সরিষা গ্রামের বাসিন্দা আবু সিদ্দিক (৭০) ও মারুফ হাসান (৩৩) বলেন, পুলিশকে মারধর করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। দুই গ্রামের প্রায় সব পুরুষ অন্যত্র চলে গেছেন। এতে গ্রাম দুটি পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তারা।
সরিষা গ্রামের বাসিন্দা আবু সিদ্দিক ও মারুফ হাসান বলেন, ‘আমরা চাই, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি হোক। কিন্তু এমদাদুল হকের মতো নিরপরাধ মানুষ কেন গ্রেপ্তার হলেন? আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে এমদাদুলের মুক্তি কামনা করছি।’
গ্রেপ্তার এমদাদুল হকের মা মনোয়ারা বেগম (৬০) বলেন, ‘আমার ছেলেকে নিয়ে প্রতিবেশী মিলনের বাড়িতে নাতনির বিয়ের দাওয়াত দিতে যাই। তখন পুলিশ আমার ছেলেকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করে। আমার ছেলে খুব সহজ-সরল। প্রকৃত দোষীদের না পেয়ে আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে।’
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজ্জাদ রোমন গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপরাধী কোন দলের হয় না। সে যেই হোক এবং যে দলেরই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।