একটি শক্তিশালী, উন্নত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বহুমুখী সম্পর্ক আরও গভীর করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে জাপানের বড় ধরনের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি লিখেছেন, ‘আসুন, একসঙ্গে একটি শক্তিশালী, উন্নত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বহুমুখী সম্পর্ককে আরও গভীর করি।’

তারেক রহমান বলেন, তাঁর চলমান জাপান সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শীর্ষ বৈঠকটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দুই দেশের নেতারা গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতি তাঁদের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল এই অংশীদারিত্বকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য বাস্তব ও দৃশ্যমান সুযোগে রূপান্তরিত করা।’

জ্বালানি নিরাপত্তায় জাপানের সহায়তা

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ৫ হাজার কোটি জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।

এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও উৎসাহব্যঞ্জক আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এতে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রযুক্তি খাতে নতুন সহযোগিতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিক্স, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

এ ছাড়া মহাকাশ বিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে সংযুক্ত করে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

‘বিগ-বি’ উদ্যোগে জোর

যৌথ সমৃদ্ধির নতুন কাঠামোর আওতায় বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।

এই সহযোগিতার আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগসেতু হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

ইপিএ বাস্তবায়নে গুরুত্ব

আলোচনায় বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদার এবং অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাবও উঠে এসেছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জাপানের অব্যাহত মানবিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে জাপানের ধারাবাহিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করেছিলেন। তাঁর মা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাপান সফর ও বিভিন্ন পর্যায়ের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছিলেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম এবং বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় দেশটি দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার।

জাপানের বন্ধুত্ব, উদারতা ও সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর তাঁর সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

চার দিনের জাপান সফর

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের মূল লক্ষ্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা ত্বরান্বিত করা।

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কানতেইতে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতা জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, রেলপথ, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিদেশি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।

বৈঠক শেষে আলোচনার ফলাফল নিয়ে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে।