সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দীর্ঘদিনের যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘবে নিজ অর্থায়নে বাঁশের চাটাই দিয়ে সাঁকো নির্মাণ করে দিয়েছেন উত্তর বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শফিকুল ইসলাম। উপজেলার ৪ নম্বর উত্তর বড়দল ইউনিয়নের বোরখাড়া-কুড়েরপাড় খেয়াঘাটে নির্মিত এই সাঁকোটি জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সাঁকোটি চালু হওয়ায় আপাতত কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে। তবে দীর্ঘদিনের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানে সেখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বোরখাড়া, চরগাঁও, রামেশ্বরপুর, হলহলিয়াসহ আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ কুড়েরপাড়। প্রতিদিন এ পথ দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, বাজারগামী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন চলাচল করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেখানে স্থায়ী সেতু না থাকায় এলাকাবাসীকে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি বৃদ্ধি পেলে এ পথে স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়। খেয়াঘাটে নৌকার মাধ্যমে মানুষ পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও মোটরসাইকেল, রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বাজারে যাতায়াত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যায় পড়তে হয় স্থানীয়দের।

এমন পরিস্থিতিতে মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বোরখাড়া-কুড়েরপাড় খেয়াঘাটে বাঁশের সাঁকো নির্মাণের উদ্যোগ নেন শফিকুল ইসলাম। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজ অর্থায়নে বাঁশের চাটাই দিয়ে সাঁকোটি নির্মাণ করেন তিনি। পরে এটি সবার চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

নৌকায় পারাপারে ভোগান্তি, সাঁকোতে স্বস্তির আশা

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, খেয়াঘাটে নৌকার মাধ্যমে পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও যানবাহন নিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও রিকশা নিয়ে এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাতায়াত করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হতো। এতে সময় ও শ্রম দুটিই বেশি ব্যয় হতো।

নতুন সাঁকো নির্মাণের ফলে এসব ভোগান্তি কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন তাঁরা। তবে বাঁশের সাঁকোটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হওয়ায় এর স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও বর্ষাকালে ব্যবহার উপযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

‘মানুষের দুর্ভোগ কমাতেই সাঁকো নির্মাণ করেছি’

এ বিষয়ে উত্তর বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যায় জর্জরিত। বোরখাড়া, চরগাঁও ও রামেশ্বরপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষ বর্ষার পানির কারণে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে পারেন না। কিছুদিন ধরে নৌকার মাধ্যমে মানুষ পারাপার হচ্ছিলেন। কিন্তু এভাবে চলাচল করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

“বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এখানে বাঁশের সাঁকো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে মানুষকে আর আগের মতো দুর্ভোগে পড়তে না হয়। বিএনপির সভাপতি হিসেবে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সাঁকোটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছি। এখন বোরখাড়া, চরগাঁও, রামেশ্বরপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষ বিনা মূল্যে এই সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে পারবেন। এ কাজে স্থানীয় বাসিন্দারাও সহযোগিতা করেছেন।”

তিনি জানান, মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের সমস্যা বিবেচনায় নিয়েই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে অনেক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সহযোগিতা

উত্তর বড়দল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাই মাস্টার বলেন, বোরখাড়া-কুড়েরপাড় দিয়ে পশ্চিম এলাকার মানুষ ও বাজারগামী লোকজন যাতায়াত করতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসুবিধায় পড়ছিলেন। নৌকায় পারাপারের কারণে মোটরসাইকেল ও রিকশা নিয়ে চলাচল করা সম্ভব হতো না। এ সমস্যা সমাধানে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম নিজ অর্থায়নে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে দিয়েছেন।

১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিন বলেন, রামেশ্বরপুর, হলহলিয়া, চরগাঁও ও বোরখাড়া এলাকার মানুষের যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই শফিকুল ইসলাম সাঁকোটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি নিজ অর্থায়নে এটি নির্মাণ করে দিয়েছেন।

উত্তর বড়দল ইউনিয়ন কৃষকদলের সহসভাপতি আব্দুল হান্নান বলেন, বোরখাড়া, হলহলিয়া, চরগাঁও ও রামেশ্বরপুরের মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য এখানে খেয়াঘাটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছিল। পরে শফিকুল ইসলাম তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে বাঁশের সাঁকো নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তাঁরা এতে সম্মতি জানান এবং নির্মাণকাজে সহযোগিতা করেন। বর্তমানে সাঁকোটি মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরোলেও স্থায়ী সেতু নেই

পৈলনপুর গ্রামের বাসিন্দা নুরুদ্দীন বলেন, “আজ আমরা যে বাঁশের চাটাইয়ের সাঁকো দেখতে পাচ্ছি, তা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) উত্তর বড়দল ইউনিয়নের সভাপতি শফিকুল ইসলাম নিজের উদ্যোগে নির্মাণ করে দিয়েছেন। কিছুদিন আগেও এ বিষয়টি নিয়ে পুরো উপজেলায় আলোচনা ও হইচই হয়েছিল। তিনি নিজ অর্থায়নে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তাকে আমরা স্বাগত জানাই।”

তিনি আরও বলেন, “স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখানে স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হয়নি। অথচ এ পথে প্রতিদিন আশপাশের এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। আমাদের দাবি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। এতে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হবে।”

স্থায়ী সেতু নির্মাণই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা

স্থানীয়দের মতে, বাঁশের সাঁকো নির্মাণের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি, সাঁকোর স্থায়িত্ব এবং নিরাপদে মানুষ ও যানবাহন চলাচলের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এখানে একটি টেকসই সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে আশপাশের গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি বাজারে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও সহজ হবে।

নিজ অর্থায়নে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে শফিকুল ইসলাম আপাতত মানুষের চলাচলের একটি বিকল্প ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি, অস্থায়ী এই ব্যবস্থার পাশাপাশি বোরখাড়া-কুড়েরপাড় খেয়াঘাটে দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক, যাতে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা যাতায়াতের দুর্ভোগের অবসান ঘটে।