শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর চলার পথকে কঠিন করে তুলেছে, কিন্তু দমিয়ে রাখতে পারেনি শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহ ও স্বপ্নকে। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে সমাজকল্যাণ বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন মোছাম্মৎ রোজিনা খাতুন। অথচ উচ্চশিক্ষিত হয়েও ভাগ্যে জোটেনি একটি চাকরি। জীবিকার তাগিদে এখন রাজশাহীর সাহেববাজার এলাকায় হুইলচেয়ারে বসে মাত্র পাঁচ টাকার বিনিময়ে মানুষের ওজন মেপে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
রোজিনা খাতুনের জীবনের গল্প যেন প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকার এক বাস্তব চিত্র। ছোটবেলায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় ধীরে ধীরে তাঁর দুই পা অচল হয়ে যায়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও চলাফেরা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এত বাধার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনো কমেনি।
অভাব-অনটন আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও স্কুলের শিক্ষক, পাড়া-প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে যান রোজিনা। নানা সংগ্রাম পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে একটি সম্মানজনক চাকরিতে যোগ দেওয়া। নিজের যোগ্যতা দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার প্রত্যাশা ছিল তাঁর।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি। দিনের পর দিন বিভিন্ন জায়গায় চাকরির আশায় অপেক্ষা করেও কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পাননি তিনি।
বর্তমানে প্রতিদিন সকাল হলেই হুইলচেয়ারে করে সাহেববাজার এলাকায় চলে আসেন রোজিনা। সঙ্গে থাকে একটি ওজন মাপার যন্ত্র। সামনে রাখা ছোট্ট একটি কাগজে লেখা—‘৫ টাকার বিনিময়ে আপনার ওজন মাপুন’। পথচারীরা তাঁর কাছে এসে ওজন মাপেন। বিনিময়ে কেউ পাঁচ টাকা, কেউবা সহানুভূতি থেকে ১০ টাকা দেন। কখনো কোনো পথচারী খাবার কিনে দিয়েও সহযোগিতা করেন।
এভাবেই সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করে চলছে তাঁর জীবন। জীবিকার প্রয়োজনে দিনের অধিকাংশ সময় বাজার এলাকায় বসে থাকতে হয় তাঁকে। উচ্চশিক্ষিত হয়েও এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া রোজিনার জন্য নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।
রোজিনার মতো একজন উচ্চশিক্ষিত প্রতিবন্ধী নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হলে তিনি কারও করুণার ওপর নির্ভর না করে সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রোজিনার প্রত্যাশা—তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক। সামান্য সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়তো বদলে দিতে পারে তাঁর জীবনের চিত্র।
প্রতিবন্ধকতা নয়, যোগ্যতা ও মেধাই হোক মানুষের মূল্যায়নের মাপকাঠি। রোজিনা করুণা নয়, চান কাজের সুযোগ ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।