মুরগির খাবার, ভ্যাকসিন, ওষুধ ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় বগুড়ার ধুনটে পোলট্রি ও লেয়ার মুরগির প্রান্তিক খামারিরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপে অনেক খামার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে গেছে। যাঁরা টিকে আছেন, তাঁদের অনেককে প্রতি মাসে লোকসান গুনতে হচ্ছে। খামারিদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পুরো ব্যবসাটিই হুমকির মুখে পড়বে।
খামারিরা জানান, গত দুই মাসে লেয়ার মুরগির খাবারের বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা আর ব্রয়লারের খাবারের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভ্যাকসিন, ওষুধ, বাচ্চা ও বিদ্যুৎ খরচের বাড়তি চাপ। খামারিদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটও বাজারে প্রভাব ফেলছে। ফলে উৎপাদন খরচ সামলে লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ধুনটে নিবন্ধিত মুরগির খামার ১৯টি। এর বাইরে উপজেলায় লেয়ার মুরগির খামার ২২৩টি, ব্রয়লারের ৬২৮টি এবং সোনালী মুরগির ৯৩২টি। এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন লেয়ার খামারিরা।
মথুরাপুরের পোলট্রি ফিড বিক্রেতা মো. লিটন বলেন, শুধু সেপ্টেম্বরেই দুই দফায় দাম বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হওয়া ব্রয়লারের খাবার এখন ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। লেয়ারের খাবার ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৩ হাজার ৫৫০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ওষুধের দাম কিছুটা বাড়লেও এখনো ক্রেতার নাগালের মধ্যে আছে, তবে ঠিক কতদিন থাকবে এটা বলা যাচ্ছে না।
ধুনট হুকুম আলী বাসস্ট্যান্ডের তোফায়েল ট্রেডার্সের মালিক আবু তাহের বলেন, খাবারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। এর সঙ্গে বাড়তে পারে ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন ওষুধের দামও। কয়েকটি কোম্পানি ইতিমধ্যে দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে তাঁদের।
চৌকিবাড়ির খামারি তোফায়েল আহমেদ বলেন, খাবারের পাশাপাশি ভ্যাকসিন ও ওষুধসহ নানা উপকরণের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। খাবারের খরচ আর ডিমের উৎপাদনের হিসাব মেলালে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর পাঁচ হাজার মুরগির খামার চালাতে এখন প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নিজের পকেট থেকে ঢালতে হচ্ছে। তিনি জানান, তাঁর এলাকায় বহু খামার বন্ধের উপক্রম। নিজেরা খাবার তৈরি করায় তাঁরা কিছুটা ভালো অবস্থায় আছেন।
কালেরপাড়া হাইস্কুল সংলগ্ন খামারি ওয়াজেদ হোসেনের অভিযোগ, ভ্যাকসিন, খাদ্য ও ডিমের দামের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। ডিমের দাম ১০ টাকার নিচে নামলে লোকসানে বিক্রি করতে হয়। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।
দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি মুরগির রোগবালাইও খামারিদের বিপদ বাড়িয়েছে। পাঁচথুপী গ্রামের বড় খামারি কামরুল ইসলামের পাঁচ হাজার মুরগির খামার এখন বন্ধ। তিনি জানান, ব্লাড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে তাঁর প্রায় ১ হাজার ৫০০ মুরগি মারা গেছে। বাকিগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর ক্ষতি ১১ লাখ টাকার বেশি। ঋণ শোধ করতে এখন হিমশিম খাচ্ছেন। কামরুল ইসলামের আক্ষেপ, প্রাণিসম্পদ অফিসে নিবন্ধন করলেও তিনি কখনো পরামর্শ, ভ্যাকসিনসহ কোনো সহায়তা পাননি। তাঁর মতে, অফিসটি গবাদিপশু নিয়ে কাজ করলেও খামারিদের বিষয়ে তেমন আগ্রহী নয়।
উপজেলা সদর ইউনিয়নের চালাপাড়ার খামারি মাসুদ হোসেন বলেন, খাদ্য, বিদ্যুৎ, ভ্যাকসিন ও ওষুধের দাম বাড়ায় এবং ডিমের দাম কমে যাওয়ায় পোলট্রি খামারিরা বড় ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছেন।
ডিমের দামও খামারিদের হতাশা বাড়িয়েছে। খামারি আবু তালেব জানান, তিনি প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করে খামার করেছিলেন। কিন্তু শুরু থেকেই কম দামের কারণে লাভের বদলে লোকসান হচ্ছে। গত মাসে প্রতিটি ডিম ১১ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হলেও এ মাসে তা নেমে এসেছে ৯ টাকায়। মাঝে দাম কিছুটা বাড়লেও চাহিদা কমায় আবার কমে গেছে। শীত আসন্ন হলেও দাম বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি।
খামারিদের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেহানা খাতুন বলেন, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উঠান বৈঠকের মাধ্যমে খামারিদের পরামর্শ দেওয়া হয়। নিবন্ধিত খামারিদের আলাদাভাবেও পরামর্শ দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় বিনা মূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প চালানো হয়। তিনি খামারিদের অফিসে এসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, প্রান্তিক খামারিদের লোকসানের প্রধান কারণ মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও কাঁচামালের ক্রমাগত দাম বাড়া। দাম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তাঁদের লাভ নিশ্চিত করা সম্ভব।
নিবন্ধিত খামারিদের খোঁজ না নেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, অনেকেই বছরে একবার নিবন্ধন করে আর নবায়ন করেন না। ফলে তাঁরা তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।
এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ চান প্রান্তিক খামারিরা। তাঁদের দাবি, খাদ্য, বাচ্চা, ওষুধসহ সব উপকরণের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিম ও মুরগির ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
খামারিরা মনে করেন, পোলট্রি শুধু উদ্যোক্তাদের জীবিকার মাধ্যম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান ও দেশের প্রাণিজ আমিষের জোগান। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একের পর এক খামার বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।