কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে দেশের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের কাজ পেতে যাচ্ছে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিএনইই)। চীন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ের (জিটুজি) চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে এই কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে জ্বালানি বিভাগ।
সিএনইইকে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের কাজ দেওয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য জ্বালানি বিভাগের প্রস্তাব মঙ্গলবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদন হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাতারবাড়ীতে বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি সামিট গ্রুপের এবং অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির। দেশে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় গত পাঁচ বছর ধরে তৃতীয় একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করে আসছে জ্বালানি বিভাগ।
এর আগে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের বিষয়ে সামিটের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সেই চুক্তি বাতিল করে দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। গত মার্চে সৌদি আরবের কোম্পানি আরামকোর সঙ্গে এ বিষয়ে চলমান আলাপ-আলোচনাও বাতিল করে জ্বালানি বিভাগ।
এরপর গত মাসে জিটুজি পদ্ধতিতে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরবসহ ১২টি দেশ ও কোম্পানির কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়। তবে সেই প্রক্রিয়া মাঝপথে স্থগিত হয়ে যায়।
সরকারি সূত্র জানায়, মাতারবাড়ীতে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করে গত ২৬ জুলাই জ্বালানি বিভাগে প্রস্তাব দেয় সিএনইই। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২২ মাসের মধ্যে মাতারবাড়ীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করতে পারবে তারা। তবে বর্তমানে তাদের নিজস্ব কোনো এফএসআরইউ প্রস্তুত নেই। নতুন করে এফএসআরইউ নির্মাণ করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।
সিএনইই কোনো দরপত্র বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, জিটুজি পদ্ধতিতে বাংলাদেশে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ করতে আগ্রহী।
জানা গেছে, সিএনইইর একটি প্রতিনিধিদল প্রস্তাব দেওয়ার পর ঢাকায় চীনা দূতাবাসের বাণিজ্যিক বিভাগ জ্বালানি বিভাগকে একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, সিএনইই একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি খাতে ক্রয় কার্যক্রম ও অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে চীন সরকারের সুপারিশ রয়েছে।
চীনা দূতাবাসের চিঠি পাওয়ার পরই মাতারবাড়ীতে সিএনইইকে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়। মঙ্গলবারের বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, কোনো টেন্ডারের মাধ্যমে নয়, সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬-এর ৬৮ ধারা এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এর ৯৯(২) ও ১০৭(২) বিধি অনুযায়ী জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
মাতারবাড়ীতে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনে কমপক্ষে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে। এই টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো। তবে গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেটি বন্ধ রয়েছে। ফলে বর্তমানে অন্য একটি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এতে সারা দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ২১ জুলাইয়ের আগে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে তা কমে প্রায় ২১৩ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী ১ আগস্ট এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হতে পারে।
এদিকে মঙ্গলবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সরাসরি ক্রয়নীতিমালার আওতায় ১৫ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার ২০টি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।