চাকরির প্রলোভনে পাহাড়ি তরুণদের রাখাইনে নেওয়ার অভিযোগ, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে উঠছে নানা তথ্য

চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-যুবকদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে। বান্দরবান, রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার বেকার তরুণদের টার্গেট করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, দালালদের মাধ্যমে তরুণদের এককালীন অর্থ এবং মাসিক বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে আরাকান আর্মির ক্যাম্পে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর তাদের যুদ্ধে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত দুই বছরে অন্তত ৪০০ তরুণ-যুবক সীমান্ত পেরিয়ে রাখাইনে গেছেন বলে দাবি করা হলেও এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণকে ভালো চাকরি ও বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়ার তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও রয়েছে। তারা সেখানে যুদ্ধ করছে নাকি অন্য কোনো কাজে যুক্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত তথ্য নেই। অবৈধভাবে রাখাইনে যাওয়া ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

কক্সবাজারের ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম জানান, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযানে কয়েকজন বাংলাদেশি পাহাড়ি তরুণ ও যুবককে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কেউ কেউ সশস্ত্র গোষ্ঠীটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। পরে তাদের স্থানীয় থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

সীমান্তে দালালচক্র সক্রিয়

সংশ্লিষ্টদের দাবি, পাহাড়ি তরুণদের সীমান্তের ওপারে পাঠাতে একটি দালালচক্র কাজ করছে। তরুণদের এককালীন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। রাখাইন স্বাধীন হলে সরকারি চাকরির আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সীমান্ত পার হওয়ার পর তাদের আরাকান আর্মির ক্যাম্পে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। যুদ্ধে অংশ নেওয়া তরুণদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হচ্ছে।

### অভিযানে মিলেছে সম্পৃক্ততার তথ্য

২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নাইক্ষ্যংছড়ির ৩৪-পিলার সীমান্ত এলাকা থেকে তিন বাংলাদেশি যুবককে আটক করে বিজিবি। তারা সবাই মার্মা সম্প্রদায়ের বলে জানা গেছে। তাদের কাছ থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার মিয়ানমার কিয়াট জব্দ করা হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্ত থেকে দুই ব্যক্তিকে আটক করে বিজিবি। বিজিবির দাবি, তারা আরাকান আর্মির সক্রিয় সদস্য।

একই বছরের ২৩ মার্চ কক্সবাজারের খুরুশকুল তেতৈয়া ঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরাকান আর্মির ৬০ জোড়া ইউনিফর্মসহ তিন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১৫।
রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিই বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের বড় একটি অংশও জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।

আরাকান আর্মির জনবল সংকটের কারণে বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলের তরুণদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বান্দরবান ও রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণদের টার্গেট করার কথা জানা গেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিল এবং বেকার তরুণদের হতাশাকে কাজে লাগিয়ে আরাকান আর্মি তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে। তরুণদের রাখাইনে যাওয়া ঠেকাতে সরকারের উচিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।

নাইক্ষ্যংছড়ির স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, গত দুই বছরে শুধু এই উপজেলা থেকেই কয়েক শ তরুণ অবৈধভাবে রাখাইনে গেছেন। তবে এ দাবিরও স্বাধীন কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

সীমান্তবর্তী এলাকায় তরুণদের অবৈধভাবে মিয়ানমারে যাওয়া ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর অনুসন্ধানে