ছোটবেলায় সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে ‘চিত্তবিনোদনের অভাব’কে জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে পড়তে হয়েছিল। তখন বিষয়টি অনেকের কাছেই ছিল রহস্যময়। চিত্তবিনোদনের অভাবের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্পর্ক কী—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীই কমবেশি বিভ্রান্ত হয়েছে।

এক শিক্ষার্থী একবার সাহস করে শিক্ষককে প্রশ্ন করেছিল—‘স্যার, চিত্তবিনোদনের অভাবে জনসংখ্যা কীভাবে বাড়ে?’
জবাবে শিক্ষক বলেছিলেন—‘তোর বাপের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।’

প্রশ্নের উত্তর সেদিন মেলেনি। তবে বছর পেরিয়ে জাতীয় জীবনের নানা ঘটনা দেখতে দেখতে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই যেন নতুন অর্থে ফিরে আসে।

দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো একটি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে ‘জনস্বার্থে’, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’, আবার কোনো বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে ‘সংকট সমাধানের’ উদ্দেশ্যে। কিন্তু উদ্যোগের পর বাস্তবে সমস্যার সমাধান কতটা হচ্ছে, আর নতুন সমস্যা কতটা তৈরি হচ্ছে—সেটিই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।
কোনো সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলো। এরপর শুরু হলো আলোচনা, পাল্টা আলোচনা, ব্যাখ্যা, পাল্টা ব্যাখ্যা, সভা, বিবৃতি ও নতুন ঘোষণা। কিন্তু এত কিছুর পরও দেখা গেল—মূল সমস্যাটি ঠিক আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে।

বরং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু জটিলতা।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—সমস্যা সমাধানের জন্য এত আয়োজন, অথচ সমস্যা কমছে না কেন?
ব্যঙ্গের জায়গাটা এখানেই।
‘জনস্বার্থে’ নেওয়া উদ্যোগ যদি জনভোগান্তি বাড়ায়, ‘শৃঙ্খলা ফেরানোর’ পদক্ষেপ যদি নতুন উত্তেজনার জন্ম দেয়, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের’ বক্তব্য যদি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে—তাহলে সেই উদ্যোগের সাফল্য পরিমাপ হবে কী দিয়ে?
ঘোষণায়, নাকি ফলাফলে?

সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার সমাধানের চেয়ে সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকাটাই যেন বড় হয়ে উঠছে। সমস্যা থাকলে সভা আছে, কমিটি আছে, বক্তব্য আছে, সংবাদ সম্মেলন আছে, বিবৃতি আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্নটির উত্তর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—সমস্যার সমাধান কোথায়?—সেটিই অনুপস্থিত থেকে যায়।

পরিস্থিতি কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরও কয়েকটি সমস্যার জন্ম হয়। তখন পুরোনো সমস্যাটিই যেন নতুন সমস্যার ভিড়ে আড়ালে পড়ে যায়।
আর ভুলের ব্যাখ্যাও কম আকর্ষণীয় নয়।
ভুল হলে বলা হয় ‘প্রক্রিয়াগত জটিলতা’।
বিতর্ক হলে ‘ভুল বোঝাবুঝি’।

ভোগান্তি হলে ‘সাময়িক অসুবিধা’।
আর পরিস্থিতি আরও জটিল হলে—‘বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
এ যেন এক অভিনব সূত্র—
সমস্যা → উদ্যোগ → ঘোষণা → বিতর্ক → ব্যাখ্যা → পাল্টা ব্যাখ্যা → নতুন সমস্যা।
এরপর আবার নতুন উদ্যোগ।
এই চক্র চলতেই থাকে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, সব উদ্যোগের লক্ষ্য কি সত্যিই সমস্যার সমাধান, নাকি কখনো কখনো সমস্যাকে কেন্দ্র করে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করাও এর অংশ হয়ে দাঁড়ায়?

অবশ্য কোনো উদ্যোগের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে তার ফলাফল দেখা জরুরি। কারণ উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক, ফলাফল যদি মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়, তাহলে সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
ছোটবেলার সেই ‘চিত্তবিনোদনের অভাব’ তাই এখন যেন নতুন এক ব্যঙ্গাত্মক উপমা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিত্তবিনোদনের অভাবে যেমন জনসংখ্যা বাড়ে—এটা তখন বুঝিনি। এখন শুধু দেখছি, ভুল সিদ্ধান্ত, অদূরদর্শিতা ও অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপে কীভাবে এক সমস্যার সঙ্গে আরও বহুবিধ সমস্যা যুক্ত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত হিসাবটা খুব সহজ—
উপকারের ঘোষণা নয়, ফলাফলই বলে দেয় আসলে কী হয়েছে।

আর যদি উপকার করতে এসে সমস্যাই বাড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক—
‘উপকার করতে এসেছেন, নাকি অপকারটা একটু সুন্দর করে করতে এসেছেন?’

জাতীয় জীবনের উত্তরগুলো অবশ্য সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে পাওয়া যাবে না। সেগুলোর উত্তর দেবে সময়, আর তার চেয়েও বেশি—বাস্তব ফলাফল।