প্রশাসন ও পুলিশে সংস্কার জোরদার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শুদ্ধি ও সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার করা এবং অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন
সম্প্রতি ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকারী ৩২ জন সাবেক জেলা প্রশাসক (বর্তমানে যুগ্ম সচিব)কে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর আগে একই প্রক্রিয়ায় আরও ২২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা ধাপে ধাপে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকাও পর্যালোচনার আওতায় এসেছে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৯ নাসির উদ্দীন সারোয়ারকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনেও পুনর্বিন্যাস
প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতেও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করেছে সরকার।
গত ২৩ জুলাই তিনজন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং দুইজন পুলিশ সুপারসহ মোট ১৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
এর আগে জুন মাসে ৩৩ জন, মে মাসে ১৭ জন এবং এপ্রিল মাসে ১৩ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে একই আইনের আওতায় অবসরে পাঠানো হয়েছিল। ফলে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর পাঁচ মাসে মোট ৮০ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন।
সরকারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নিরপেক্ষ, দক্ষ ও জনগণমুখী করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
‘ফ্যাসিস্ট আমলের’ কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত
সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছেন—এমন কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোথাও বলেনি যে ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী, চাকরির নির্ধারিত সময় পূর্ণ হলে জনস্বার্থে কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে এবং সেই বিধানই প্রয়োগ করা হয়েছে।
তবে তিনি মন্তব্য করেন, ২০১৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ওই নির্বাচনসহ ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
পুরোনো আলোচিত মামলাতেও অগ্রগতি
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর কয়েকটি বহুল আলোচিত পুরোনো মামলার তদন্তেও অগ্রগতি হয়েছে।
গত ১৬ জুলাই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনায় বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সরকারের অবস্থান
সরকার-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রাষ্ট্র সংস্কার কেবল প্রশাসনিক রদবদলে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একটি নিরপেক্ষ, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র পুনর্গঠন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য: প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিভিন্ন মূল্যায়ন, রাজনৈতিক মন্তব্য ও বিশ্লেষণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সরকার, সূত্র বা বিশ্লেষকদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্নমত থাকতে পারে।