নীলফামারীর জলঢাকায় তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ লোডশেডিং জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে ও রাতের আরামের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। দিনে-রাতের বিভিন্ন সময়ে বার,বার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অস্বস্তি ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিশেষ করে গ্রামঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মের ফলে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে দিনের বেলায় অনেক মানুষ গাছের নিচে, পুকুরপাড়ে ও খোলা জায়গায় বসে সময় কাটাচ্ছেন। রাতের বেলায় বিদ্যুৎ চলে গেলে শহর এবং গ্রামের বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও বাসাবাড়ির সামনে নারী-পুরুষদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। গরমে ঘরের ভেতর অবস্থান করা কষ্টকর হয়ে পড়ায় অনেকেই খোলা আকাশের নিচে হাঁটাহাঁটি করছেন। 

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, সন্তানদের কষ্ট লাঘব করতে অনেক বাবা শিশু সন্তানদের নিয়ে মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেলে করে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের কান্নাকাটি ও অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ক্ষেত্রেও। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। যেমন অফিস-আদালত,ধর্মীয় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কাজগুলোতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। 
বৃহস্পতিবার সরজমিনে, বালাগ্রাম এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত হাবিবা জানান,স্কুলে প্রায় কারেন্ট চলে যায়, তখন গা ঘেমে জামা কাপড় ভিজে যায়,ওই সময় পড়াশোনা করতে ভালো লাগেনা। উক্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক  জানান,প্রায় সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে ছোট ছোট বাচ্চারা খুব কষ্ট পায়। ফলে বিশেষ করে স্কুল টাইমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখতে পারলে ভালো হয়। 

এ ধরনের অভিযোগ উপজেলার প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বলে জানা গেছে। একই গ্রামের মুসল্লী কৃষক বাসররাত মোড়ল (৫৫) জানান, জোহরের নামাজ পড়তে গেয়েছিলাম বিদ্যুৎ না থাকার কারণে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আইছি মনে করেছিলাম নামাজ শেষে  ঘণ্টা খানেক  মসজিদে ঘুম পড়বো। রাত্রিতেও বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে দোকানের বারান্দায় শুয়ে থাকি।  আরেক কৃষক তকিম উদ্দিন সরদার (৭০) ক্ষোভের সাথে জানান, সারাদিন ক্ষেতে কাজ করে  আসার পর রাতে ঠিক যে সময় ঘুম আসে ঠিক সেই সময় কারেন্টটা চলে যায়। রাতে ভালোভাবে ঘুম না পড়তে পারলে অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়। তবে এখানকার চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় এই লোডশেডিং বলে স্থানীয় সংশ্লিষ্ট অফিসের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি। সর্বোপরি, চরম বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের বিষয়টি দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু সুদৃষ্টি কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। 
স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং হতে পারে—তা তারা বোঝেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন, দিনের বেলা লোডশেডিং না দিয়ে কেন প্রতি রাতে দুইবার করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে কেন?গ্রাহকদের দাবি, প্রতিদিন রাতে  লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। প্রথম দফায় রাত ৯টা থেকে ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় রাত ১২টা থেকে রাত ১টা বা ২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। তীব্র গরমের এই সময়ে রাতের মূল ঘুমের সময়ে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
 মানুষের জোর দাবি তাদের নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক, অন্যথায় লোড শেডিংয়ের সময় পরিবর্তন করে দিনে মাত্র একবার লোডশেডিং দেওয়া হোক।
এ বিষয়ে জলঢাকা সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি আনোয়ার হোসেন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন জনগণকে বিদ্যুৎ নিয়ে আর এভাবে কষ্ট না দেয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা তো কেউ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি না। তাহলে প্রতিদিন রাতে এত দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং দিয়ে আমাদের কেন কষ্ট দেওয়া হচ্ছে?” তিনি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে অতি দ্রুত এই লোডশেডিং সমস্যার যৌক্তিক ও স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।ভুক্তভোগী এলাকাবাসী রাতে এই অমানুষিক ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
কৈমারী ইউনিয়নের গাবরোল বালাপাড়া এলাকার বাসিন্দা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন বিদ্যুৎ কখন আসে আর কখন যায় বুঝতে পারি না। এত লোডশেডিং আগে হয় নাই। রাতে ঘুমাতে পারি না। বিদ্যুৎ আসে আর যায়। গরমে খুবই করুণ অবস্থা আমাদের। তিনি আরও বলেন, দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে কোনোভাবে সময় পার করা গেলেও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কষ্ট বেড়ে যায়। তীব্র গরমে শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানোও সম্ভব হচ্ছে না অনেক এলাকায়। 
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।
গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির দাবি জানিয়েছেন।

পৌরসভার কাজিরহাট এলাকার আঁখি আক্তার বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে লোডশেডিংয়ে যন্ত্রণায় আছি। আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। সমস্যার সমাধান কবে হবে জানি না।’

জলঢাকা উপজেলায় লোড শেডিংয়ের মধ্যে দিনে-রাতে মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর এসেছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নেসকো ও পল্লী বিদুৎ সমিতি তাদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে। 

দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা হচ্ছে- জানতে চাই