নওগাঁর ধামইরহাটে মেরিনা বেগম (৪৫) নামে এক নারীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনায় মামলা হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বেল্ট ও ভিকটিমের ফেলে দেওয়া জুতার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে ধামইরহাট থানাধীন ২ নম্বর আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের তালপুকুর মাহমুদপুর (ভালকাডাঙ্গা) এলাকায় একটি আমবাগানের গভীর জঙ্গলে আগুনে পোড়া অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ।
খবর পাওয়ার পর নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ধামইরহাট থানার অফিসার ইনচার্জ ও পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ আগুনে পোড়া মরদেহের পাশে ভিকটিমের ব্যবহৃত প্রসাধনী সামগ্রী ও পরিচয়পত্র দেখতে পায়।
এদিকে একই সময়ে কাউসার আলী তার মায়ের নিখোঁজের বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে আসেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি মরদেহটি তার মা মেরিনা বেগমের বলে শনাক্ত করেন। মেরিনা বেগম ১৪ আগস্ট গরুর জন্য ঘাস কাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি।
ঘটনাটি প্রথমে ক্লুলেস হত্যা হিসেবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। সিআইডি ও পিবিআইকে বিষয়টি অবহিত করার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় তদন্ত ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়।
পরে মধ্যরাতের পর পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ ও ধামইরহাট থানার অফিসার ইনচার্জ মিন্টুর নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়। টানা ছয় থেকে সাত ঘণ্টার অভিযানে প্রথমে ধামইরহাট উপজেলার মড়লই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মোঃ বাবুল হোসেন (৪৯) এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই গ্রামের মোঃ তারেক রহমান (২১)কে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুই আসামি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানানো হয়। তাদের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বেল্ট এবং ভিকটিমের জুতার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, মেরিনা বেগমের সঙ্গে গ্রেপ্তার আসামি বাবুল হোসেনের পূর্বপরিচয় ও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ ছিল। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মেরিনা বেগম বাবুল হোসেনকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তাকে বিয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়।
পুলিশের দাবি, ১৬ আগস্ট মেরিনা বেগমকে বিয়ের কথা বলে বাড়ি থেকে বের করে আনা হয়। পরে বাবুল হোসেনের নির্দেশে তারেক রহমানসহ আরও দুই ব্যক্তি তাকে সাহাপুর এলাকা থেকে আগ্রাদ্বিগুন বাজারে নিয়ে আসে।
সেখানে বাবুল হোসেন একটি তেলের দোকান থেকে তিন লিটার পেট্রোল কেনেন। পরে তারা মেরিনা বেগমকে নিয়ে মনিহারী-তালপুকুর সড়কের পাশে একটি আমবাগানে যায়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, সেখানে তারেক রহমানের কোমরে থাকা বেল্ট দিয়ে মেরিনা বেগমের গলায় ফাঁস দেওয়া হয় এবং অপর দুই ব্যক্তি তাকে চেপে ধরে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহের পরিচয় নষ্ট করার উদ্দেশ্যে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
পরে ভিকটিমের একটি জুতার ব্যাগ আমবাগানের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর আসামিরা বাবুল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে ভিকটিমের কাছ থেকে নেওয়া টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুইজন ছাড়াও আরও দুইজন জড়িত রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, নৃশংসভাবে হত্যার পর মরদেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদঘাটন করেছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নওগাঁ জেলা পুলিশ জেলার যেকোনো ধরনের অপরাধ আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে দমন করতে এবং অপরাধ প্রতিরোধে সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।