জামালগঞ্জে বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১২ কৃষকের লিখিত অভিযোগ, তদন্তের নির্দেশ।

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকারের বিরুদ্ধে হাওর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দের চাল ও টাকা বিতরণে অনিয়ম, চাল ওজনে কম দেওয়া এবং হোল্ডিং ট্যাক্সের নামে কৃষকদের কাছ থেকে কৌশলে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গ্রামের ১২ জন কৃষক স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন রুবেল ইসলাম নয়ন, ওয়াসিম আকরাম, মাসুম রেজাসহ ১২ জন কৃষক। তারা অভিযোগে দাবি করেন, সরকারি বরাদ্দের ১৫ কেজি চাল ও ৩ হাজার টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বরাদ্দকৃত ১৫ কেজি চালের পরিবর্তে অনেক কৃষককে প্রায় ১৩ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।
৩০০ টাকা না দিলে চাল-টাকা দেওয়া হয়নি—অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে কৃষকরা উল্লেখ করেন, গত ১৬ ও ১৭ আগস্ট বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দের ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি চাল বিতরণ করা হয়। এ সময় কৃষকদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে দাবি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরকারি সহায়তা নিতে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে জানতে পারেন, ৩০০ টাকা না দিলে তাদের চাল ও টাকা দেওয়া হবে না। এতে অনেক কৃষক তাৎক্ষণিকভাবে বিপাকে পড়েন। সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় কেউ কেউ বাড়িতে ফিরে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে ৩০০ টাকা সংগ্রহ করে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসেন।
অভিযোগে বলা হয়, ওই টাকা নেওয়ার পর কৃষকদের হাতে হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাদের সরকারি বরাদ্দের চাল ও টাকা দেওয়া হয়। তবে ১৫ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক কৃষককে প্রায় ১৩ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
‘চাল কম দেওয়ার পর বাড়তি চাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে’
কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দের চাল কম দেওয়ার পর অবশিষ্ট চালের একটি অংশ ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত কয়েকজন ব্যক্তি রাতের আঁধারে বাড়িতে নিয়ে গেছেন। এ বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনা চলছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য ও অভিযোগ দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারীরা বলেন, তারা দরিদ্র ও হাওরনির্ভর কৃষক। বোরো ফসলের ক্ষতি ও নানা সংকটে এমনিতেই তাদের পরিবারগুলো আর্থিকভাবে দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে। সরকারি সহায়তা পাওয়ার সময় যদি অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় কিংবা বরাদ্দের চাল কম দেওয়া হয়, তাহলে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য আরও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের দাবি, বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
চেয়ারম্যানের নির্দেশে সচিবের মাধ্যমে টাকা আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকারের নির্দেশেই ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) প্রদীপ কুমার রায় এভাবে টাকা আদায় ও চাল বিতরণের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) প্রদীপ কুমার রায়ের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা কৃষকদের ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল মেপে দিয়েছি। আর হোল্ডিং ট্যাক্সের টাকা তো ইউনিয়নের নাগরিকদের কাছ থেকে রশিদের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে।”
চাল ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চাল ওজনে কেউ কম পেয়েছে—এমন অভিযোগ কেউ আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানায়নি। কম পেলে বা আমাকে জানালে বিষয়টি আমিও দেখতাম।”
তদন্তের পর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইউএনওর
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রাণী মোদকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “কৃষকদের লিখিত একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তের জন্য দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
এদিকে, অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি সহায়তা যথাযথভাবে বিতরণ হয়েছে কি না, কৃষকদের কাছ থেকে আদায়কৃত ৩০০ টাকা প্রকৃতপক্ষে হোল্ডিং ট্যাক্সের অর্থ কি না এবং ১৫ কেজি চালের পরিবর্তে কম চাল দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয় এখন তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি সহায়তা বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা দ্রুত চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে সরকারি বরাদ্দের পূর্ণ সুবিধা পান, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।