ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে রামদা হাতে এক যুবকের তাণ্ডবে প্রায় তিন ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার ঘটনায় জননিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পারিবারিক নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে নান্দাইল-কানুরামপুর-মধুপুর আঞ্চলিক সড়কের নাউড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সকালে রামদা হাতে সড়কের ওপর অবস্থান নেন রমজান মিয়া (৩২)। একপর্যায়ে তিনি সড়কের ওপর কলাগাছ ফেলে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন। এ সময় রামদা উঁচিয়ে পথচারী ও চালকদের দিকে তেড়ে গিয়ে ভয়ভীতি দেখাতে থাকেন। তাঁর ভয়ে কেউ কাছে যাওয়ার সাহস না পাওয়ায় সড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় কৌশলে ওই যুবককে অবরুদ্ধ করে আটক করা হয়। পরে সড়ক থেকে কলাগাছসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রমজান মিয়া ওই এলাকার কলুম উদ্দিন মেম্বারের ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তাঁর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে পরিবারের সদস্যরা সাধারণত তাঁকে বাড়িতে রাখতেন। মাঝে মধ্যে তাঁর আচরণ স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ আবার অস্বাভাবিকতা বেড়ে যেত।
শনিবার সকালে পরিবারের সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি ঘর থেকে একটি ধারালো অস্ত্র নিয়ে সড়কে চলে আসেন বলে জানা গেছে। এরপর সড়ক অবরোধ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন তিনি।
ঘটনাটি শুধু একজন যুবকের অস্বাভাবিক আচরণের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না স্থানীয় সচেতন মহল। তাঁদের মতে, মানসিক সমস্যায় থাকা কোনো ব্যক্তির আচরণ যখন হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, তখন বিষয়টি শুধু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা জননিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে পরিবারের নজর এড়িয়ে ধারালো অস্ত্র নিয়ে জনসমাগমপূর্ণ সড়কে চলে এলেন? ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে পরিবার, স্থানীয় সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নজরদারি কতটা কার্যকর—সেটিও নতুন করে ভাবার বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক সমস্যাকে সামাজিক লজ্জা বা গোপনীয়তার বিষয় হিসেবে না দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে এমন ব্যক্তির নাগালের বাইরে ধারালো অস্ত্রসহ ঝুঁকিপূর্ণ সামগ্রী রাখা এবং সংকট দেখা দিলে দ্রুত প্রশিক্ষিত সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এমন সব মানুষকে সহিংস বা বিপজ্জনক হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। বরং এ ধরনের ঘটনায় ব্যক্তির চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা—দুই বিষয়কেই গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আযম বলেন, অস্ত্রধারী যুবকের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। কোনো ধরনের হতাহত ছাড়াই তাঁকে আটক করা হয়েছে। পরে জানা গেছে, তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ঘটনাটি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পরিবারের নজরদারির ঘাটতি, অস্ত্রের নিরাপদ সংরক্ষণ এবং জননিরাপত্তা—এই চারটি বিষয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা না থাকলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে কি না।