বাংলাদেশে হীরার বৈধ আমদানি প্রায় বন্ধ থাকলেও দেশে হীরার গয়নার বাজার বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের চাহিদার প্রায় পুরো হীরাই এখন অবৈধ পথে আসছে। পাশাপাশি ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড, মোইসানাইট, জিরকনসহ বিভিন্ন কৃত্রিম পাথর প্রাকৃতিক হীরা হিসেবে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ কোটি টাকার হীরা ও হীরার গয়না চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে। সে হিসাবে বছরে অবৈধভাবে আসা হীরা ও গয়নার বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উচ্চ শুল্কে বাড়ছে চোরাচালান

সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ পথে হীরা আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক অন্যতম বড় বাধা। বাংলাদেশে পলিশড বা কাটিং করা হীরা আমদানিতে প্রায় ১৫১ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। অপরিশোধিত হীরার ক্ষেত্রেও শুল্কের হার প্রায় ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত।

ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, উচ্চ শুল্কের কারণে বৈধ পথে হীরা আমদানিতে আগ্রহ কমছে। অধিক মুনাফার আশায় আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে হীরা দেশে আনা হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম বড় হীরা কাটিং ও পলিশিং কেন্দ্র ভারতের সুরাট। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সুরাট থেকে কলকাতা হয়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে হীরা দেশে প্রবেশ করে।

বেনাপোল-যশোর-সাতক্ষীরা রুটে নজর

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, বেনাপোল, যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো হীরা চোরাচালানের অন্যতম ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আকারে ছোট হওয়ায় হীরা সহজেই শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিংবা সাধারণ পণ্যের মধ্যে লুকিয়ে পার করা সম্ভব।

সাম্প্রতিক সময়ে বিজিবির অভিযানে যশোর সীমান্ত থেকে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি এবং সাড়ে ৬ কোটি টাকা মূল্যের দুটি বড় হীরার গয়নার চালান জব্দ করা হয়েছে।

গত ২ এপ্রিল যশোরে এক ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে ১৫৫ দশমিক ৭৬ গ্রাম হীরা এবং প্রায় ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করে বিজিবি। এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি যশোরের পাঁচভুলোট সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের হীরার গয়নাসহ একজনকে আটক করা হয়।

২০২১ সালে সাতক্ষীরায় প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ১৪৪টি হীরার গয়নাও উদ্ধার করা হয়েছিল। বিভিন্ন সময় বিজিবির আরও কয়েকটি অভিযানে হীরা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

হুন্ডিতে অর্থ পাচারের অভিযোগ

অবৈধ পথে আসা হীরার মূল্য পরিশোধে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করা কঠিন হওয়ায় হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে।

সিআইডির সাম্প্রতিক এক তদন্তে দেশের একটি জুয়েলারি ব্র্যান্ড ‘ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড’-এর বিরুদ্ধে সোনা ও হীরা চোরাচালানের মাধ্যমে প্রায় ৬৭৮ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

আসল হীরার নামে বিক্রি হচ্ছে কৃত্রিম পাথর

চোরাচালানের পাশাপাশি বাজারে নকল ও কৃত্রিম পাথর বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড, মোইসানাইট, জিরকন, এমনকি কাচ ও প্লাস্টিকের পাথরও কোথাও কোথাও প্রাকৃতিক হীরা হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বৈধ আমদানির কাগজপত্র ও নির্ভরযোগ্য সার্টিফিকেশন না থাকায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল ও নকল পাথরের পার্থক্য করা কঠিন। ফলে অনেক ক্রেতা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশে এক ক্যারেট প্রাকৃতিক হীরার দাম ৮৩ হাজার টাকার বেশি হতে পারে। সে তুলনায় কয়েক হাজার টাকায় হীরার নাকফুল বা গয়না বিক্রির বিজ্ঞাপন স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

২০২২ সালে লন্ডন ও নিউইয়র্কভিত্তিক সলিটেয়ার জেমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিজ বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। ঢাকার বাংলামোটরে প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষাগারে হীরা পরীক্ষা করে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরীক্ষার মাধ্যমে বাজারে থাকা প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম—দুই ধরনের পাথরই শনাক্ত করা হয়েছে।

ক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ

হীরার অলংকার কেনার ক্ষেত্রে প্রতারণা এড়াতে ক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি ভুয়া বা অননুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্র থেকে হীরার অলংকার না কেনার আহ্বান জানায়।

বাজুসের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৫০ সেন্টের বেশি ওজনের হীরার গয়নার ক্ষেত্রে সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি হীরার গয়নায় ১৮ ক্যারেটের কম মানের স্বর্ণ ব্যবহার না করা এবং বিক্রির সময় ক্যাশ মেমোতে গুণগত মান উল্লেখ করার কথা বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হীরার বৈধ আমদানি বাড়াতে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা, চোরাচালান রোধে সীমান্ত নজরদারি জোরদার এবং ক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক হীরার পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখের ব্যবস্থা করা গেলে প্রতারণা অনেকটাই কমানো সম্ভব।