সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সিএ রিমন সরকারের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিয়ে ও প্রতারণার অভিযোগ। পরকীয়ার, ভুয়া কাবিননামা তৈরির দাবি; দুই সন্তানকে নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ প্রথম স্ত্রী।
সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের হিসাব সহকারী (সিএ) হিসেবে কর্মরত রিমন সরকারের বিরুদ্ধে পরকীয়ার সম্পর্ক, গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে, কাবিননামা জালিয়াতি এবং স্ত্রীকে তালাক দিতে চাপ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এনে স্বামীকে সংসারে ফিরিয়ে আনা এবং দুই কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁর প্রথম স্ত্রী সায়মা শফি তন্বী।
আদালতে দেওয়া লিখিত আবেদনে সায়মা শফি তন্বী দাবি করেন, ২০১৯ সালের ২০ জুন পারিবারিকভাবে রিমন সরকারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে আরিবা আর নূর (আয়রা) ও ছোট মেয়ে আয়জা মাননুর (এলিনা)—তাদের বয়স প্রায় ছয় ও তিন বছর।
আবেদনে সায়মা উল্লেখ করেন, বিয়ের পর কয়েক বছর তাঁদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক থাকলেও ২০২৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রিমন সরকার ঢাকায় প্রশিক্ষণে যাওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ওই প্রশিক্ষণের সময় চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর জান্নাতুল সাবরিন মিতুর সঙ্গে তাঁর স্বামীর পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে রিমন সরকার ও মিতুর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে—এমন অভিযোগ করে সায়মা বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একাধিকবার বিরোধ ও মনোমালিন্য হয়। এতে তাঁদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং দুই সন্তানও বাবার স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সায়মার লিখিত আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৯ মে চুয়াডাঙ্গার আক্কাস আলী পার্কের একটি ওয়াশরুমে রিমন সরকার ও জান্নাতুল সাবরিন মিতুকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান পার্কে ঘুরতে আসা কয়েকজন পর্যটক। তাঁরা ঘটনাটি ভিডিও করে রাখেন বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সায়মার দাবি, পরবর্তীতে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে টিকটকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি চুয়াডাঙ্গায় জানাজানি হয়। এতে মিতুর চাকরি নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
প্রথম স্ত্রীর অভিযোগ, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মিতুর চাকরি রক্ষার উদ্দেশ্যে রিমন সরকারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে—এমন দাবি করে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদে একটি আবেদন দেওয়া হয়। ওই আবেদনের সঙ্গে একটি কাবিননামাও জমা দেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন সায়মা।
তিনি বলেন, কাবিননামায় বিয়ের তারিখ ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ উল্লেখ করা হয় এবং নরসিংদীতে কাজী শহিদুল্লাহর চেম্বারে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখানো হয়। সেখানে ভলিউম নম্বর ১৯/A ও পৃষ্ঠা নম্বর ৭৪ উল্লেখ করা ছিল বলেও তাঁর আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে সায়মার অভিযোগ, তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওই বিয়ের বৈধতা যাচাই করতে গিয়ে জানতে পারেন, কাবিননামাটি প্রকৃত নয় এবং কাজীর স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহারে জালিয়াতি করা হয়েছে। এ বিষয়ে কাজীর ছেলে মাহমুদুল হাসান অবগত হওয়ার পর তাঁর বাবার নাম ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগে রিমন সরকারের বিরুদ্ধে নরসিংদীতে ২৮/০৬/২০২৬ ইং তারিখে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১৪৪১) করেছেন বলেও দাবি করেছেন সায়মা।
সায়মা আরও অভিযোগ করেন, প্রথম কাবিননামা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর রিমন সরকার ও মিতু পরবর্তীতে ঝিনাইদহের একটি কাজী অফিসে আবার বিয়ে করেন। সেই বিয়ের কাবিননামাও মিতু তাঁর চাকরি সংশ্লিষ্ট নথিতে জমা দেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
সায়মার ভাষ্য, এসব ঘটনা তাঁর কাছ থেকে গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান থাকা অবস্থায় অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ও বিয়ের ঘটনায় তিনি এবং তাঁর দুই সন্তান সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
প্রথম স্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, তাঁকে দুই সন্তানসহ তালাক দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি তালাকনামায় স্বাক্ষর না করলে তাঁকে ও তাঁর দুই সন্তানকে ক্ষতি করার ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।
এ অবস্থায় নিজের সংসার রক্ষা, সন্তানদের বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়া ঠেকানো এবং অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রতিকার চেয়ে তিনি আদালতের পাশাপাশি সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদেও আবেদন করেছেন বলে জানান।
সায়মা তাঁর আবেদনে প্রশ্ন তুলেছেন, এত গুরুতর অভিযোগ ও একাধিক বিয়ের বিষয় সামনে আসার পরও রিমন সরকার কীভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। তিনি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, তাঁর মূল উদ্দেশ্য স্বামীকে সংসারে ফিরিয়ে এনে দুই সন্তানকে বাবার স্নেহ-ভালোবাসার মধ্যে বড় করা। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে যেসব প্রতারণা ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোরও আইনগত প্রতিকার চান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জান্নাতুল সাবরিন মিতুর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যোগাযোগের বিষয়টি রিমন সরকারকে জানানো হলে তাঁর পক্ষ থেকে বক্তব্য না নেওয়ার জন্য নিষেধ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রিমন সরকার বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। তবে প্রথম স্ত্রী সায়মা শফি তন্বীর করা অভিযোগগুলোর সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের মিল নেই বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে জান্নাতুল সাবরিন মিতুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, কথিত দ্বিতীয় বিয়ে এবং কাবিননামা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
রিমন সরকারের বক্তব্যে, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক ও পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি দীর্ঘদিনের। এসব বিরোধের সঙ্গে পরবর্তীতে মিতুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি জড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
কাবিননামা জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে রিমন সরকার তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের দায় স্বীকার করেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিয়ে ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার প্রকৃত সত্য সংশ্লিষ্ট কাজী কার্যালয়ের রেজিস্টার, কাবিননামা এবং অন্যান্য সরকারি নথি যাচাই করলেই পরিষ্কার হবে।