স্টেশন আছে, অবকাঠামো আছে—নেই শুধু যাত্রীসেবা।

একসময় টিকিট কাউন্টারের সামনে থাকত দীর্ঘ সারি। প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতেন নানা বয়সী মানুষ। কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের যাতায়াতের অন্যতম সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম ছিল রেলপথ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী রেলস্টেশন দুটি করোনা মহামারির সময় বন্ধ হয়ে যায়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন রুটে রেল যোগাযোগ চালু হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ দুটি স্টেশনে আগের মতো যাত্রীসেবা আর ফিরে আসেনি। ফলে স্টেশন দুটি এখন অনেকটা নামেই রয়েছে, বাস্তবে কার্যক্রম প্রায় অচল।

স্টেশন আছে, প্ল্যাটফর্ম আছে, স্টেশন ভবন ও রেললাইনের অবকাঠামোও রয়েছে। নেই শুধু ট্রেন থামার সেই পরিচিত শব্দ, যাত্রীদের কোলাহল, টিকিট বিক্রির ব্যস্ততা আর রেলকেন্দ্রিক প্রাণচাঞ্চল্য।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। রেলসেবা না থাকায় যাত্রীদের বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া দিয়ে সড়কপথে চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য এ বাড়তি ব্যয় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যাতায়াতেও বাড়ছে সময় ও খরচ।

শুধু যাত্রী নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও। এ অঞ্চলের কৃষিপণ্য ও অন্যান্য মালামাল তুলনামূলক কম খরচে রেলপথে পরিবহনের সুযোগ থাকলেও স্টেশন বন্ধ থাকায় সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং পণ্যের বাজারমূল্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্টেশনগুলোর বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথাও প্ল্যাটফর্মে জমছে ময়লা-আবর্জনা, কোথাও আবার গরু-ছাগল বাঁধার দৃশ্য দেখা যায়। পরিত্যক্ত অবস্থার সুযোগ নিয়ে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু রাতেই নয়, দিনের বেলাতেও পরিত্যক্ত স্টেশন এলাকায় নানা ধরনের মানুষের আনাগোনা ও আড্ডা বসে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।

স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘একসময় ঈশ্বরগঞ্জ রেলস্টেশনে সবসময় মানুষের ভিড় লেগে থাকত। স্টেশন ছিল জমজমাট। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, ততই স্টেশনটির অবস্থা খারাপ হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের তেমন কোনো ছোঁয়া এখানে লাগেনি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেখভালের অভাবে মূল্যবান অনেক জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছে।’

ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী রেলস্টেশন শুধু দুটি স্থাপনা নয়; এগুলো এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। তাই এগুলো বন্ধ পড়ে থাকা মানে শুধু দুটি স্টেশনে ট্রেন না থামা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী রেলস্টেশনে পূর্ণাঙ্গ যাত্রীসেবা পুনরায় চালু করতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে নিয়মিত ট্রেনের যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্টেশন দুটির অবকাঠামো সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

রেলপথ মানুষের জন্য—আর রেলস্টেশনও মানুষের সেবার জন্য। তাই দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী রেলস্টেশনকে আবারও মানুষের কোলাহলে মুখর করে তোলা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি কমাতে এবং এই অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে দ্রুত স্টেশন দুটি চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।