অকার্যকর ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অবসান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে তীব্র বিতর্কের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। প্রথম দিনেই সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, উন্নয়ন প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন, পুলিশ সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, মূল্যস্ফীতি ও জনদুর্ভোগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা।
অধিবেশনের শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। একই সঙ্গে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দায়িত্ব গ্রহণকে স্বাগত জানান স্পিকার। ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর বিরতিতে ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াকে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
স্পিকার বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছে। শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে গণতান্ত্রিক, শক্তিশালী ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অধিবেশনে পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীও ঘোষণা করা হয়। তারা হলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জামাল নিজাম, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, নিলুফার চৌধুরী মনি ও মুজিবুর রহমান।
শোক প্রস্তাব ও নেপালের বন্যায় সমবেদনা
অধিবেশনে সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও মন্ত্রী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকারসহ সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিক, কবি, শিল্পী ও শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়।
এ ছাড়া বন্ধুপ্রতিম নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় সংসদের পক্ষ থেকে শোক ও সমবেদনা জানানো হয়। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, নেপালের দুর্যোগে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্ধার ও মেডিকেল টিম পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।
হট্টগোলে ক্ষুব্ধ স্পিকার
শোক ও শ্রদ্ধা পর্ব শেষে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও হট্টগোলে। সদস্যদের অসহিষ্ণু আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্পিকার বলেন, সংসদের ভেতরে এ ধরনের অসহিষ্ণুতা এবং স্পিকারের নির্দেশ উপেক্ষার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংসদের ভবিষ্যৎ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমানের মধ্যে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অসংসদীয় আচরণ করছেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আচরণকে ‘সংসদীয় ফ্যাসিবাদ’ আখ্যা দিয়ে দুঃখ প্রকাশের দাবি জানান।
জবাবে স্পিকার বলেন, বক্তব্যে অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা পরীক্ষা করে এক্সপাঞ্জ করা হবে। তবে কোনো সদস্যকে কথা বলতে না দিয়ে সমস্বরে চেঁচামেচি করা সুস্থ সংসদীয় রীতি নয়।
আইনশৃঙ্খলা উন্নতির দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালে দেশে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা কমেছে।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে দেশে ২ হাজার ৬০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে ২ হাজার ৩৩২টিতে দাঁড়িয়েছে। মব সহিংসতার ঘটনাও ৮৯টি থেকে কমে ৫৬টিতে নেমেছে। সংখ্যালঘু-সংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনা ৯৯৯টি থেকে কমে ১৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকরের কথাও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাও করা হচ্ছে। ট্রাফিক জরিমানা, জিডি ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ডিজিটাল করা হয়েছে এবং বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।
‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা হয়েছে’
সংসদে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, গত ১৫ বছরের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘মক্কা প্যাক্ট’ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মুসলিম সমাজের নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক ব্যবস্থা হতে পারে। সদস্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে বাংলাদেশ তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের দায়িত্ব অর্জনকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদটি বাংলাদেশের জন্য গৌরবের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১০ সপ্তাহের নিবিড় প্রচারণার মাধ্যমে এই অর্জন এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া জলবায়ু অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক অনুদান এবং আন্তঃসীমান্ত পানি সম্পদ নিয়ে কাজ করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিশেষ অনুবিভাগ চালুর কথা জানান তিনি। বিদেশি মিশনগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়নে ‘কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ বা কেপিআই পদ্ধতি চালুর কথাও বলেন।
গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সঙ্গে কাজ
অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ভারতের কাছে নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে কারিগরি মূল্যায়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি সংসদে জানান, বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা ২ হাজার ৪০০টির বেশি উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে নেওয়া প্রকল্পের কারণে দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিন জেলা বা বিভাগভিত্তিক সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণের নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। মেগা প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়েছে। তবে সব প্রকল্প কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হবে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ে সংসদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যঙ্গ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এখন বলছে—‘টুকু আসে, টুকু যায়।’
তিনি দাবি করেন, বাজারে ৮০ টাকার নিচে অনেক সবজি পাওয়া যাচ্ছে না এবং টিসিবির ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরছে। বেকারত্ব, কারখানা বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।
ওয়াকআউট বিরোধী দলের
জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালী নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে শিল্প-কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান কমছে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় নিত্যপণ্যের দামও বাড়ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অতিরিক্ত ‘ভুতুড়ে বিল’ নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, জরুরি অধিবেশন আহ্বানের জন্য রাষ্ট্রপতি ও স্পিকারের কাছে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। গণভোটে সংস্কারের পক্ষে জনরায় পাওয়া সত্ত্বেও সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান না করায়ও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন।
ল্যাপস হওয়া অর্ডিন্যান্স নিয়ে বিরোধীদের ক্ষোভ
বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ সংস্কার ও নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্স ল্যাপস হতে দেওয়া হয়েছে। এতে পুরোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া বৃহস্পতিবার ‘বেসরকারি সদস্য দিবস’ হওয়া সত্ত্বেও সরকারি বিল উত্থাপন এবং বিরোধীদের নোটিশ নিয়ে আলোচনা না করার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধী সদস্যরা।
ওয়াকআউটের সমালোচনা সরকারের
বিরোধীদের সংসদীয় ধারায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কথায় কথায় ওয়াকআউট করলে গণতন্ত্রেরই ক্ষতি হবে। সংসদকে কার্যকর করতে না পারলে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খাবে এবং এর দায় ইতিহাস বিরোধী দলের ওপরও দেবে।
তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল সংসদে উত্থাপন ও কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তুতি ছিল। বিরোধীদের সংসদ ত্যাগকে এসব বিল উত্থাপনের অজুহাত হিসেবে মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু, এফএসআরইউ নির্মাণ ও এলএনজি সরবরাহসহ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল
অধিবেশনের প্রথম দিনেই গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সংসদে তোলা হয়েছে।
একই দিনে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের জন্য আরও একটি বিল উত্থাপন করা হয়।
ফলে প্রথম দিনেই পররাষ্ট্রনীতি, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন প্রকল্প, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য ও সংস্কার ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সরগরম হয়ে ওঠে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন।