চরম হুমকিতে পানি নিরাপত্তা
অকেজো লাখ লাখ নলকূপ, শুকিয়ে গেছে নদী-খাল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ধরমণ্ডল গ্রামের রুহুল আমিন চৌধুরী এক দশক আগে খাবার পানি ও সেচের জন্য দুটি গভীর নলকূপ বসিয়েছিলেন। একটি বাড়িতে। আরেকটি চাষাবাদের জন্য জমিতে। চার বছর আগে সেটি দিয়ে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যায়।
পরে সাবমার্সিবল পাম্প যুক্ত করেন। তিন বছর পানি উঠলেও এখন আর উঠছে না। একই গ্রামের খসরু চৌধুরীর দুই বছর আগে বসানো পাম্পেও পানি ওঠে না। নিচে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর।
পাশের বলভদ্র নদীটি শুকিয়ে চৌচির। পরিণত হয়েছে খালে। বন্ধ হয়ে গেছে ইরি আবাদ। বাড়ির নলকূপে পানি না ওঠায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট।
আগে যেখানে ৭০ থেকে ৮০ ফুট গভীর থেকে নির্বিঘ্নে পানি উঠত। এখন সেখানে ১৫০-২০০ ফুট গভীর থেকে পানি তুলতে হচ্ছে। এ জাতীয় পাম্পগুলোও কতদিন সচল থাকে তার নিশ্চয়তা নেই। শুধু গ্রাম নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের বেশির ভাগ বাসাবাড়ির নলকূপেও পানি উঠছে না। এ চিত্র এখন দেশের বহু জেলার।
ভূপৃষ্ঠের পানির উৎস কমছে, ভূগর্ভস্থ স্তর নামছে- দুই দিক থেকেই চাপে বাংলাদেশ। অচল হয়ে পড়েছে লাখো নলকূপ। ফেনীতে ১ লাখ ৬৭ হাজার নলকূপে পানি উঠছে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য বিভাগ। সুনামগঞ্জের ছাতকে ১৮ হাজার নলকূপের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার অকেজো। যশোরের কেশবপুরে এ বছরই পানির স্তর ৩-৪ ফুট নিচে নেমেছে। গত ২৮ অক্টোবর গেজেট প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ১৫৩টি ইউনিয়ন ও ৭২টি মৌজাকে পানি সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়। সরকারি হিসাবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়ন অতি উচ্চ, ৪০টি উচ্চ এবং ৬৬টি মধ্যম মাত্রার সংকটে রয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৪৬৫টি অগভীর পর্যবেক্ষণ কূপের ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে বছরে ১ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে। ঢাকায় ১৯৯৬ সালে পানির স্তর ছিল ২৫ মিটার গভীরে। ২০১০ সালে ৬০ মিটার, আর ২০২৪ সালে ৮৬ মিটারে নেমেছে। অর্থাৎ অনেক এলাকায় এখন প্রায় ২৮২ ফুট গভীরে পাইপ নামাতে হচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসা প্রতিদিন ২৯০-৩০০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে, যার প্রায় ৭০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। কৃষি খাতে ব্যবহৃত পানির ৬৫-৭০ শতাংশও আসে ভূগর্ভ থেকে। ঢাকার চারপাশে নদী থাকলেও দূষণের কারণে সেগুলোর পানি ব্যবহার অনুপযোগী। গাজীপুরে প্রায় তিন হাজার পোশাক কারখানার চাহিদা মেটাতে গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে; অনেক এলাকায় প্রতি বছর ৪-৫ ফুট পর্যন্ত পানির স্তর নামছে। কাগজে-কলমে দেশে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি নদী থাকলেও বাস্তবে দুই-তৃতীয়াংশই অস্তিত্বহীন বা মৃতপ্রায়। ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে বর্ষায় সচল থাকে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার; এর বড় অংশের গভীরতা দেড় মিটারেরও কম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৮ বছরে ঢাকা অঞ্চলের ৮৫ শতাংশ জলাভূমি হারিয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উজানের প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিকা ইউনূস বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া, নদ-নদীর নাব্য ও প্রবাহ কমে আসা, শিল্পদূষণ ও লবণাক্ততার বিস্তার- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এক গভীর সুপেয় পানির সংকটের দিকে এগোচ্ছে। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে উপকূলীয় জেলা- প্রায় সর্বত্রই একই চিত্র : নলকূপে পানি উঠছে না, পুকুর-খাল শুকিয়ে যাচ্ছে, আর গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বিপজ্জনক হারে। জলাধার ভরাট ও কংক্রিটায়ন বাড়ায় বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে ঢুকতে পারছে না। উত্তরবঙ্গের সেচ পুরোপুরি ভূগর্ভনির্ভর। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেচ ব্যয় বাড়বে, কৃষি উৎপাদন কমবে, খাদ্যদাম ঊর্ধ্বমুখী হবে।
তিনি বলেন, পানি সংকট এখন কেবল পরিবেশ বা অবকাঠামোর ইস্যু নয়- এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির প্রশ্ন। কার্যকর নীতি ও কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া দেশ সুপেয় পানির কঠিন সংকটে পড়বে।
পানির দামের ঊর্ধ্বগতিও সংকটের বার্তা দিচ্ছে। মরু দেশ সৌদি আরবে খুচরা বাজারে ১ লিটার বোতলজাত পানির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৩২ থেকে ৯৭ টাকার সমপরিমাণ। বাংলাদেশে ১ লিটার বোতলজাত পানি ৩০ টাকা; পাঁচতারকা হোটেলসহ কিছু স্থানে ২০০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসা গত ১ মার্চ থেকে এটিএম বুথের পানির দাম লিটারে ২০ পয়সা বাড়িয়েছে; ২০২৩ সালের ১ আগস্টেও দ্বিগুণ করা হয়েছিল। খুলনা ওয়াসা ১ মার্চ থেকে ৫ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে; গত ১০ বছরে আটবার মূল্য বাড়িয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, পানি সংকট এখন ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, বর্তমান বাস্তবতা। দূষণের কারণে পানি বিশুদ্ধকরণ খরচও বাড়ছে। সমন্বিত জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল জরুরি। অবিলম্বে নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, শিল্পে পুনর্ব্যবহৃত পানি বাধ্যতামূলক, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও কৃত্রিম পুনর্ভরণ, কৃষিতে সাশ্রয়ী সেচপ্রযুক্তি, পানি ব্যবহারে দরিদ্রদের জন্য লাইফলাইন ট্যারিফ চালু, ভূগর্ভের ওপর নির্ভরতা কমানো, শিল্প ও পয়োবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি আন্তসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্সা নিয়ে দ্রুত আলোচনার তাগিদ দিয়ে বলেন, ফারাক্কা চুক্তি শেষের পথে। সরকারের খাল খনন উদ্যোগের প্রশংসা করে এই অধ্যাপক বলেন, একই সঙ্গে নদীর প্রবাহ না বাড়ালে খালগুলো পানি পাবে না।






















