লাগাম ছাড়া নির্মাণসামগ্রীর দাম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। বাড়তি দামের পণ্য দেশে না এলেও কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে গেছে। রডের দাম বেড়েছে প্রতিটনে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। আগে রহিম স্টিল প্রতিটন ৭৮ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ৯৩ হাজার টাকা, একেএস রড ৯৬ টাকায় ঠেকেছে। অন্য কোম্পানির রডও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ব্যাগ সিমেন্টে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আগে কম দামে ফ্রেশ সিমেন্ট বিক্রি হলেও বর্তমানে ৪৮৫ টাকা, আকিজ ৫২০ টাকায় বস্তা বিক্রি হচ্ছে। অন্য কোম্পানির সিমেন্টও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন কোম্পানির রং ও ক্যাবলের দামও বেড়েছে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানি বাড়িয়েছে। আমাদের কিছু করার নেই। আমরা বেশি দামে আমদের কিনতে হচ্ছে। তাই আগের দামে বিক্রি করা সম্ভব না।
শনিবার (১১ এপ্রিল) বিভিন্ন বাজারে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাড়তি দামের ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের মেসার্স বিক্রমপুর স্টিলের স্বত্বাধিকারী মো. রাকিব হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর রড সিমেন্টের চাহিদা অনেক কমে যায়। বিক্রিও কমে অর্ধেকে নেমে যায়। এ জন্য প্রতিটন রডে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা কমে রহিম স্টিল ৮১ হাজার ৫০০ টাকা, বিএসআরএম ৮৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সিমেন্টের দামও বস্তায় ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে শাহ সিমেন্ট ৪৯০ টাকা, ফ্রেশ সিমেন্ট ৪৬৫ টাকা বস্তা বিক্রি হয়। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার গঠন করলে মানুষ কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। মনে করে ব্যবসা কিছুটা হবে। কিন্তু সেই মাসেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে হঠাৎ করে দাম বাড়তে থাকে। কিছু দিন থেকে টনে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা বেড়েছে। বর্তমানে রহিম স্টিল রড ৯৩ হাজার টাকা টন, একেএস রড ৯৬ হাজার টাকা। বিএসআরএম রডের দাম আরও বেশি। সিমেন্টের দাম বেড়ে গেছে বস্তায় ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ফ্রেশ কোম্পানির সিমেন্ট ৪৮৫ টাকা, বসুন্ধরা ৫১০ টাকা আকিজ আরও বেশি ৫২০ টাকা বস্তা বিক্রি করা হচ্ছে। কোম্পানি থেকে বাড়িয়েছে দাম। আমরা কীভাবে কম দামে বিক্রি করব?’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা দাম কমানো-বাড়ানোর ব্যাপারে কিছুই না। মিলমালিকরা হচ্ছেন প্রধান পার্ট। তারা কমালে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারব। আমরা সামান্য লাভ করি। ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি। বেশি দাম হলে আমাদের খারাপ লাগে। এতে বিক্রি কমে যায়। দাম কমলে চাহিদা বাড়ে।’
শুধু এই খুচরা ব্যবসায়ীই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের অন্য ব্যবসায়ীরা বলেন, বেড়েছে রড-সিমেন্টের দাম।
এ ব্যাপারে প্রিমিয়ার সিমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হক বলেন, ‘সিমেন্টের দাম বেড়েছে। কারণ আছে। কারণটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়েছে। যুদ্ধের প্রভাবেই এই বাড়তি দাম বলা যায়।’
এদিকে নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে বার্জার পেইন্টসসহ বিভিন্ন কোম্পানি রংয়ের দাম বাড়িয়েছে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। খুচরা বিক্রেতারা জানান, বেশ কয়েক দিন থেকে কোম্পানির প্রতিনিধিরা জানান, আগের দামে আর রং বিক্রি করা সম্ভব না। ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যা এ সপ্তাহ থেকে ভোক্তাদের কিনতে হবে। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের মেসার্স বিক্রমপুর জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. বাবু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা বার্জার কোম্পানিসহ বিভিন্ন কোম্পানির ডিলার। বার্জার কোম্পানি থেকে বলা হয়েছে সব রংয়ের দাম বেড়েছে, যা এ সপ্তাহ থেকেই বাজারে বিক্রি হবে এবং ক্রেতাদের বাড়তি দামে কিনতে হবে। বর্তমানে ১৮ লিটারের এক ড্রাম পাট্টি বিক্রি হচ্ছে ১৮৫০ টাকা, প্লাস্টিক ড্রাম ৫৭০০ টাকা, ডিস্টেম্বর ২৩৫০ টাকা ও লাক্সারি ড্রাম ১২ হাজার ২০০ টাকা, যা এ সপ্তাহ এসব পণ্যে ১০ শতাংশ যোগ হবে।’
এ ব্যাপারে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে এটা আমি বলতে পারছি না। মার্কেটিং বিভাগ বলতে পারবে।’
অন্য খুচরা বিক্রেতা এবং ডিলাররাও একই তথ্য জানান। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন কোম্পানির পিভিসি বোর্ড, পারটেক্স বোর্ডসহ ইন্টেরিয়রের কাজে ব্যবহৃত সব পণ্যের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ১০ শতাংশ। একইভাবে বিআরবি কেবলসহ অন্য কোম্পানির তারের দামও বাড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে টাউন হল বাজারের মোহাম্মদপুর ট্রেডার্সের মালিক মো. কামাল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘তার, সকেটসহ এমন কোনো পণ্য নেই যে দাম বাড়েনি। তা ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।’ কাপ্তানবাজারসহ অন্য বাজারের বিক্রেতারাও জানান, ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের দাম বেড়েছে।
রাজধানীর আদাবর থানার মেসার্স মদিনা স্টিল করপোরেশনের বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. মেহেদী হাসানও জানান, শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও রড সিমেন্টের দাম বেড়েছে। মিলমালিকরা বলছেন, বাস্তবতা মেনেই ব্যবসা করতে হচ্ছে। এক সময়ে চাহিদা কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় দাম কমানো হয়েছে।
ঢাকার বাইরেও একই চিত্র বলে বিভিন্ন রড সিমেন্ট কোম্পানির সংশ্লিস্টরা জানান। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর হাটের মেসার্স আলতাফ অ্যান্ড সোন্সের স্বত্বাধিকারি মেজবাউল হক খবরের কাগজকে জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বহু দূর আমাদের পথ। তাই এ সব এলাকায় একটু দাম বেশি হওয়ায় স্বাভাবিক। তাই আগের তুলনায় বেশি দামে রড ও সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসকে মাসাদুল আলম মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ড. ইউনূস সরকারের আমলে ব্যবসায়ীরা ভয়ে আতঙ্কে ব্যবসা করতে পারেনি। দেশে মানুষ আতঙ্কে ছিলেন। তখন চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতিটনে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লোকশান করে ব্যবসা করতে হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠন করার মানুষের আশা জাগে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে এই খাতেও প্রভাব পড়ে। কারণ স্টিলের অধিকাংশ কাঁচামাল স্ক্যাপ আমদানি করতে হয়। তবে ৯০ হাজার টাকা টন স্ট্যান্ডার্ড বলা যায়। এর বেশি দাম। এটাও কাম্য নয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার তথা এনবিআর থেকে এ খাতে বিভিন্ন ধরনের অযাচিত কর ও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কালাকালুন আইনও করা হয়েছে। তার প্রয়োগ করা হচ্ছে। আবার ডলারের দামও ৩৫-৪০ শতাংশ বেড়েছে। তাই ডলারের দাম ও শুল্ক হার কমানো না হলে তেমন কমবে না রডের দাম।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, দেশে স্বয়ংক্রিয় ইস্পাত কারখানা আছে ৩০টি। সনাতন পদ্ধতির কারখানা আছে ১০০টির মতো। বছরে এসব মিলে রডের উৎপাদন সক্ষমতা (প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি) রয়েছে ৯০ লাখ টন। বছরে দেশে রডের চাহিদা আছে ৫৫-৬০ লাখ টন। এ হিসেবে মাসে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টন রড দরকার হয়। রড তৈরির কাঁচামাল হলো স্ক্যাপ ও দেশের পুরনো লোহার টুকরো। এই কাঁচামাল সরাসরি আমদানি করে প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করেন উৎপাদকরা। বাকি প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ আসে জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং লোকাল ভাঙারি বর্জ্য থেকে। কিন্তু সরকার বেশি কর শুল্ক ধার্য করায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। যা প্রভাব ভোক্তাদের ঘারে পড়ছে। এ জন্য রডের দর বেশি।























